শনিবার, ৯ এপ্রিল, ২০১১

উপন্যাস: বৈজ্ঞানিক ভালোবাসা

পর্ব-১
নিজ অফিসের চেয়ারে বসে কফির মগে চুমুক দিচ্ছে ইউসুফ আদনান। ভাবখানা ঠিক যেন আয়েশ করে পায়েশ খাওয়ার মতো! দৃশ্যটি দেখলে যে কারো মনে হবে এমন সুখী মানুষ পৃথিবীতে বোধ হয় আর দ্বিতীয়টি নেই। স্যূট টাই পরে প্রতিদিন এমনভাবে অফিসে আসা যাওয়া করে যেন বারাক ওবামা হোয়াইট হাউসে যাওয়া আসা করছে। ইউসুফের এভাবে অফিসে বসে থাকা নিয়ে সেদিন তার এক ছড়াকার বন্ধু চট করে একখানা ছড়া বানিয়ে দিল। ‘কাজহীন বেচারা/  কেউ নাই সে ছাড়া!/ ....বসে থেকে অফিসে/ পান করে কফি সে!!’ ছন্দ আর অন্তমিলের দারুণ সমন্বয়!

এই পৃথিবীতে সোনার চামচ মুখে নিয়ে অনেকেই জন্মায় তবে মোটেও সেরকম জন্ম ছিল না ইউসুফ আদনানের। গ্রামের সামান্য এক স্কুল মাষ্টারের ঘরে জন্ম তার। বাবা আরমান আলীর পুরো জীবনটাই কেটেছে মানুষ গড়ার পেছনে। ধন-সম্পদের কথা কোনদিন চিন্তা করেননি তিনি। তবে সন্তানদের মানুষ করার ব্যাপারে তাঁর ছিল এক অন্যরকম সচেতনতা। নিজে স্কুলে মাস্টারি করতে গিয়ে তাঁর মনে এই ধারণা জন্মেছিল যে, লেখা- পড়া করার জন্য স্কুল কলেজে পড়ার আসলে কোন প্রয়োজন নেই। কারণ স্কুলে আসা-যাওয়া করে কারো তেমন একটা কিছু শেখা হয় না। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরাই প্রাইভেট পড়ে পরীক্ষা পাস করে। তিনি যেহেতু নিজেই ভাল শিক্ষক, তাই তাঁর সন্তানদের স্কুলে দেবেন না, সিদ্ধান্ত নিলেন মাস্টার আরমান আলী। তাঁর প্রথম সন্তান সাব্বির সোলায়মান একদম ক্লাস টেন পর্যন্ত বাড়িতেই পড়াশোনা করল। কেবল নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নিল এস.এস.সি’র। আরমান আলী তখন নিজেই একটি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। তাই এ ব্যতিক্রম নিয়মে পরীক্ষায় অংশ নিতে কোন সমস্যা হয়নি সোলায়মানের। নির্বাচনী পরীক্ষাটাই ছিল সোলায়মানের শিক্ষা জীবনের প্রথম একাডেমিক অংশ গ্রহন! আর কী আশ্চর্য সেই পরীক্ষায় সোলায়মান প্রথম স্থান অর্জন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিল। পরবর্তীতে এস.এস.সি-তে প্রথম বিভাগে কেবল পাসই করেনি বরং পুরো সেন্টারে সর্বাধিক নম্বর লাভ করেছিল সে। আরমান আলীকে আর পায় কে! তাঁর বৈজ্ঞানিক ফর্মুলাটি কাজে লেগেছে। তিনি গর্ব করে সকলের কাছে এই খবরটি ছড়িয়ে দিলেন। সারা জীবন যে ছেলে স্কুলে তো দূরে থাক, স্কুলের বারান্দায় পা রাখেনি, সেই কিনা পুরো এলাকার সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র হয়ে গেল। আরমান আলীর ছেলে বলে কথা। বাবার মান রেখেছে ছেলেটি।

আনন্দে আত্মহারা হয়ে আরমান আলী তাঁর দ্বিতীয় সন্তান সানজিদা বেগমকেও স্কুলে এডমিশন নিতে দিলেন না। সানজিদার বয়স যখন ছয় পেরিয়ে যাচ্ছে তখন আরমান আলীর স্ত্রী হাফসা বেগম একদিন বলেই বসলেন, মেয়েটাকে তো স্কুল- মাদ্রাসা কোথাও ভ ির্ত করানো দরকার।
‘কেন, স্কুলে না গিয়ে কি আমার সোলায়মান ভাল রেজাল্ট করেনি?’ স্ত্রীর প্রতি আরমান আলী পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন।
‘সে করেছে বটে, তবে মেয়ে বলে কথা। সানজিদা তো আর সোলায়মানের মতো শহরে গিয়ে কলেজে পড়ার সুযোগ পাবে না। এমন বাড়ন্ত মেয়ে বয়স পনেরো-ষোল হবার আগেই বিয়ের পিড়িতে বসতে হয় কি না কে জানে?’ হাফসা বেগমের কণ্ঠে হতাশার সুর।
‘শোন, এসব আজে-বাজে চিন্তা মাথা থেকে দূর কর। আমার মেয়ে সানজিদা বাড়িতে পড়ালেখা করেই মেট্রিক দেবে ঠিক সোলায়মানের মতো। আর এসব বিয়ে-টিয়ে আজকাল আঠারো বছর বয়সের আগে কারো হয় না। আইনে বাধা আছে।’
‘এমন আইন আগে কেন করল না সরকার। তাহলে তো আমাকে বাবা মাত্র তেরো বছর বয়সে আপনার ঘরে পাঠাতে পারতো না।’ আবারো হতাশার সুরে বললেন হাফসা বেগম।
আরমান আলীর মুখটা কিন্তু বেশ উজ্জল হয়ে উঠল স্ত্রীর কথা শুনে। মুচকি হেসে বললেন, ‘তোমাকে পেয়ে আমি ধন্য হতাম না আগে এমন আইন কার্যকর থাকলে!’ স্বামীর মুখে এমন কথা শুনে লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল হাফসা বেগমের মুখ।
‘তোমার মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা?’ স্ত্রীকে কাছে টেনে আদুরে গলায় জানতে চাইলেন আরমান আলী।
‘কোন দিনগুলো?’ নিজেকে যথাসম্ভব আগলে রেখে বললেন হাফসা বেগম।
‘ওই যে, যখন আমি তোমাকে প্রাইভেট পড়াতে যেতাম তোমাদের বাড়িতে।’
‘যাহ!’
‘জানো তুমি যখন ক্লাস ফাইভের পরীক্ষা শেষ করলে তার কিছুদিন পর একটি লোকাল বাসে তোমার বাবার সাথে আমার দেখা হয়। তিনি আমাকে দেখেই বললেন, ‘‘জানেন মাস্টার সাহেব আমার মেয়েকে তো ঘরছাড়া করেই দিলাম।’’ তোমার বাবার মুখে এমন কথা শুনে আমার বুকটা ধক্ করে উঠেছিল। ভাবছিলাম বুঝি তোমার বিয়ে হয়ে গেছে। জানতে চাইলাম, কার সাথে ঘরছাড়া করলেন হাফসাকে। তখনই তোমার বাবা হেসে বললেন, ‘‘আরে না, হাফসা নয়, পান্নার বিয়ে দিলাম। আমার বড় মেয়ে।’’ সেদিনই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম তোমাকে আর কারো ঘরে যেতে দেব না।’ রসিয়ে রসিয়ে বলছিলেন আরমান আলী আর লজ্জায় লাল হচ্ছিল হাফসা বেগমের মুখ। এভাবেই সুখের সংসারে বেড়ে উঠতে লাগলো সানজিদা বেগম। আরমান আলীর একমাত্র মেয়ে। স্কুলে না দিলেও বাড়িতে পড়াশোনার দায়িত্বটা নিলেন স্বয়ং অত্র অঞ্চলের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আরমান আলী। মাস্টারির পাশাপাশি দাবা খেলার প্রতি ছিল যার এক অন্যরকম নেশা। স্কুল ছুটির পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সহকর্মীদের সাথে দাবা খেলায় মগ্ন থাকাটাই একসময় তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়। এলাকায় মোটামুটি এ খবরটি রটে যেতে বেশিদিন সময় লাগেনি যে, আরমান আলী স্যারকে দাবা খেলায় গেইম দেওয়া সহজ কথা নয়। সেই সাথে  ‍সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো আরমান আলীর অসাধারণ কাব্য প্রতিভার। একাধারে শিক্ষাগুরু, দাবাড়ু আবার কবি। ধন সম্পদের দিক দিয়ে সাধারণ হলেও অন্যান্য দিক দিয়ে আরমান আলী ছিলেন সত্যি অসাধারণ। অংক, ইংরেজি আর বিজ্ঞানসহ স্কুলের এমন কোন সাবজেক্ট নেই যেখানে আরমান আলী ওস্তাদ নন। এমনকি আরবীতেও তার সাথে পেরে উঠতেন না বিভিন্ন মাদ্রাসার আরবী শিক্ষকেরা! এমন প্রতিভাবান এক মহান ব্যক্তির সন্তানেরা স্কুলে পড়ে না, এ খবরটি রীতিমতো অবাক করে দিত যে কাউকে! যদিও তাঁর বড় ছেলে সাব্বির সোলায়মান কোনদিন স্কুলে না গিয়েও ইতোমধ্যে এস.এস.সি-তে সেরা ফলাফল অর্জনের পর শহরের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে এইচ.এস.সিতেও প্রথম বিভাগ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।  আরমান আলীর তৃতীয় সন্তান মানে দ্বিতীয় ছেলে সিদ্দিক আহসানকেও একই নিয়মে স্কুলে পাঠানো হলো না।

সিদ্দিক আহসানের বয়স যখন পাঁচ, বড়বোন সানজিদার বয়স তখন দশ। ঠিক এ রকম সময়ে পৃথিবীর বুকে আগমন ঘটে ইউসুফ আদনানের। রূপে গুণে অনন্য। সম্ভবত তাঁর অসাধারণ রূপের কারণেই ‘ইউসুফ’ নামটি নির্বাচিত হয়েছিল। ইউসুফের জন্মের পর ‘মাস্টারের ঘরে চাঁদ এসেছে’ এমন কথা দশগ্রামে রটে গিয়েছিল। অনেকেই দল বেঁধে দেখতে যেত চাঁদের মতো ফুটফুটে সেই ছেলেটিকে। কে জানতো বড় হওয়ার পর এই ছেলেটি পারিবারিক ধ্যান ধারনার বাইরে চলে যাবে। মাস্টারের ছেলে তো মাস্টার হওয়ারই কথা। কিন্তু সে কেন ‘বিজনেস ম্যাগনেট’ হতে চাইবে। তাঁর বড় ভাই সাব্বির সোলায়মান যখন ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করে আমেরিকার একটি ইউনিভার্সটির প্রফেসর, মেজো ভাই যখন মধ্যপ্রাচ্যের বহুল আলোচিত কম্পউটার ইঞ্জিনিয়ার, তাঁর একমাত্র বোন সানজিদা বেগম নিজে কোন পেশায় না গেলেও দুলাভাই যেখানে একটি কলেজিয়েট স্কুলের স্বনামধন্য শিক্ষক, তাঁর মামারা এবং মামাতো ভাই বোনেরাও যখন শিক্ষকতার মহান পেশায় নিজেদের নিয়োজিত রাখছে ঠিক সেই সময় অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেই ব্যবসা করার ঘোষণা দিল ইউসুফ আদনান। ব্যবসায় কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, বড় অংকের কোন পুঁজি প্রাপ্তিরও সম্ভাবনা নেই তবুও বিজনেস ম্যান হতে চায় ইউসুফ আদনান!



দুই.

‘চাকুরী তো তারাই করে যারা চাকর, আর আমার পক্ষে চাকর হওয়া সম্ভব না। তার চেয়ে বরং বাদাম বিক্রেতা হয়ে ঘুরে বেড়াবো।’ মুখে হাসি টেনে ইউসুফ আদনান এমন কথা বললেও এটাই যে তার মনের কথা সেটা মানতে চাইলেন না বড় ভাই প্রফেসর ড. সাব্বির সোলায়মান।

‘তোমার কথার কোন যুক্তি নাই। বাদাম বিক্রেতা হলে তোমার অসুবিধা নাও হতে পারে কিন্তু আমার অসুবিধা আছে।’ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন ড. সোলায়মান। বসার ঘরে সোফায় মুখোমুখি বসা দুই ভাই। ইউসুফ আদনান তখন সবে মাত্র মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছে। ড. সোলায়মান ইন্ডিয়ায় একটি সেমিনারে যোগ দিতে আমেরিকা হতে যাওয়ার পথে দেশে অবস্থান করছেন।

‘আমি আর এক সপ্তাহ আছি, এর মধ্যে তোমার ডিসিশন জানাবে। তবে ব্যবসা করতে চাইলে আমি কিন্তু কোন সাপোর্ট করতে পারবো না বলে রাখলাম।’ ড. সোলায়মানের কণ্ঠে আদেশের সুর। এসময় ঘরে এসে প্রবেশ করলেন মিসেস জাহানারা সোলায়মান। ইউসুফ আদনানের শ্রদ্ধেয়া ভাবী।
‘কেন ছোট ভাইটাকে এমন বকাবকি করছো? সে ব্যবসা করতে চাইলে করুক না, সমস্যা কি?’ বললেন ইউসুফের ভাবী। ইউসুফ জানে এসব কথার কোন গুরুত্ব নেই। তার বড় ভাই যেটা বলেছেন তাতেই অনঢ় থাকবেন তিনি। আর সেটাই তার জন্য কল্যাণকর। কিন্তু তার পক্ষে  সেটা মানা সম্ভব না। কারণ ছোট খাটো ব্যবসায় যে ইতোমধ্যে তার হাতে খড়ি হয়ে গেছে। অন্যের অধীনে চাকরী করার যে কি ঝামেলা হতে পারে তা অনুভব করে সে নিজের অধীনস্থ কর্মচারীদের কথা চিন্তা করে। তবুও বড় ভাইয়ের কথার পিঠে আর কোন কথা বলতে সাহস পায় না ইউসুফ। কারণ তিনিই তো তার অভিবাবক। পিতা আরমান আলীর মৃত্যুর পূর্ব থেকেই তার এবং পরিবারের অন্যদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিয়েছেন ড. সোলায়মান। ছাত্র জীবনে সাব্বির সোলায়মানের বেশ নাম ডাক ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম মেধাবী ছাত্র হওয়ার পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতিতেও জড়িত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। একটি ছাত্র সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি পদে থাকা অবস্থাতেই মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করার গৌরবজনক রেকর্ড অর্জন করতে পেরেছিলেন এই সাব্বির সোলায়মান। সংগঠন তখন তাঁকে কেন্দ্রীয় কমিটির সেক্রেটারি পদে দায়িত্ব দিতে চাইলেও নিজের পরিবারের কথা এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবেই দল থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। কিছু দিনের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক পদে জয়েন করে বাড়িতে খবর পাঠালেন। চিঠি লিখলেন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পিতা আরমান আলীর কাছে। চিঠির সারমর্ম হলো এই যে, আমি জানি আপনি এ খবরে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হয়েছেন। তবে আমি আনন্দিত হবো তখনই যখন আপনারা সবাই আমার বাসায় চলে আসবেন স্থায়ীভাবে।

এলাকার মাটি ও মানুষের সাথে দূরত্ব তৈরি করে কোন অবস্থাতেই শহরে যেতে চাইলেন না আরমান আলী। ইউসুফ তখনও পারিবারিক নিয়মের কারণেই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। তবে ক্লাস এইটের গন্ডি অতিক্রম করছে। নতুন বছরে ক্লাস নাইনে রেজিস্ট্রেশন করার কথা। সিদ্দিক আহসান মাত্র ইন্টারমিডিয়েট দিয়েছে স্থানীয় কলেজ থেকে। মাস্টার আরমান আলী যে কারণে তাঁর সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে নিজের বাড়িতে বিকল্প স্কুল তৈরি করেছিলেন তার সাফল্য কেবল বড় ছেলে সাব্বির সোলায়মানের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। অন্যরা তাকে হতাশ করেছিল। একমাত্র মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেনি কেবল এই বাড়িতে পড়ালেখা করার কারণেই। বিয়েটাও দিয়ে দিলেন বয়স আঠারোতে পড়তেই। দ্বিতীয় ছেলে সিদ্দিক আহসান যথা নিয়মে বাড়িতে পড়ালেখা করেই এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। রেজাল্ট তেমন ভাল হয়নি। আর ইউসুফ তো অনেকটাই ভবঘুরে হয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলো গ্রাম থেকে গ্রামে। এসব নিয়ে তেমন একটা মাথাও ঘামাতেন না আরমান আলী। বড় ছেলের কাছ থেকে চিঠি আসার পর ইউসুফের সাথে কথা বললেন আরমান আলী।
‘তোমার পড়ালেখার যা অবস্থা তাতে কি মনে হয় আগামী বছর ক্লাস নাইনে এডমিশন নিতে পারবে?’  এমনভাবে প্রশ্নটি করলেন আরমান আলী যেন তিনি জানেনই সে পারবে না।
‘আমি পারবো।’ মাথা নিচু করে হাতের নখ কুটত কুটতে জবাব দিল ইউসুফ আদনান। বাবাকে অসম্ভব রকমের শ্রদ্ধা তারা ভাই-বোন সকলেই করতো। পিতা এবং শিক্ষক, একের ভেতর দুই। ইউসুফ অবশ্য নিজেও জানতো পড়াশোনা নিয়মিত না করার কারণে সে ক্লাস নাইনের ছেলেদের সাথে ব্যালেন্স করতে পারবে না। বাবা ঠিকই বলছেন। তবুও পারবো বলার কারণ হলো লোকে জেনে গেছে সে এখন ক্লাস এইটে পড়ে। আর পরের বছর যদি ক্লাস নাইন বলা না যায় তাহলে তার জীবনের মহাভারত অশুদ্ধ হবার কি আর কিছু বাকী থাকবে? অন্যদিকে ইউসুফের মুখে এমন দৃঢ়তাপূর্ণ জবাব দেখে আরমান আলী অনেকটাই দু:শ্চিন্তামুক্ত হয়ে গেলেন। ভাবলেন ‘দেখতে হবে না ছেলেটা কার?’ অবশেষে নতুন বছর চলে এল। ইউসুফ আদনানও স্কুলে গেল। কিন্তু ইউসুফের নতুন জীবনে ছন্দ পতন ঘটালেন বড় ভাই সাব্বির সোলায়মান। চিঠি দিয়ে কাজ না হওয়াতে তিনি সরাসরি বাড়িতে এলেন ঈদের ছুটিতে। দাবী একটাই, সবাইকে শহরে যেতে হবে। তার সাথে একমত হলেন মা হাফসা বেগম। ইউসুফের মনেও প্রচুর আগ্রহ শহরে যাওয়ার জন্য। মুখে তেমন কিছু না বললেও সোলায়মান ঠিকই বুঝতে পারলেন ছোট ভাইটির মনের অবস্থা। শেষ পর্যন্ত পিতাকে রাজী করাতে না পেরে ইউসুফকে নিয়েই চলে গেলেন তিনি শহরে। বনানীতে নতুন বাসায় উঠলেন। ইউসুফ আদনান তো একেবারে মুগ্ধ।



তিন.

ভালোবাসা কাকে বলে জানা ছিল না ইউসুফ আদনানের। তবে ফারিয়ার প্রতি তার যে একটা অন্যরকম আকর্ষণ ছিল  তা ঠিকই টের পেত ১৪ বছর বয়সী এই কিশোর। ফারিয়া তাদের গ্রামেরই এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। তখনো মাত্র ক্লাস সেভেনের ছাত্রী! প্রতিদিন অন্তত একবার দু’জনের দেখা হতো। ফারিয়া প্রায়ই খেলতে আসতো ইউসুফদের বাড়িতে। তাছাড়া পাড়ার ছেলে-মেয়েরা প্রতিদিন বিকালে যে মাঠে খেলার জন্য জড়ো হতো সেটাও ছিল ইউসুফদের বাড়ির পাশেই। বিকাল বেলা বাড়ির পাশে খেলার মাঠে কিংবা বাড়ির আঙিনায় কোথাও ফারিয়াকে না দেখলেই মনের ভেতর কেমন জানি অচেনা এক অনুভূতি কাজ করতো ইউসুফের। কে জানে এরই নাম হয়তো প্রেম। ফারিয়াও প্রতিদিন ইউসুফের দেখা পাওয়ার আশাতেই ইউসুফদের বাড়ির ধারে ঘুরঘুর করতো এসে। কখনো ইউসুফকে কোথায় না দেখলে বিভিন্ন অজুহাতে সোজা চলে যেত ইউসুফদের ঘরে। অজুহাত তৈরি করতেও তেমন কোন বাধা ছিল না। কারণ ইউসুফের মা হাফসা বেগম ছিলেন গ্রামের অঘোষিত চিকিতসক। কারো পেট ব্যথা, মাথা ব্যথা কিংবা বমি বমি ভাব কমিয়ে দিতে তাঁর একটি ফুঁকই ছিল যথেষ্ট। কারো চোখের মধ্যে বালু জাতীয় কিছু ঢুকলে দু’হাতে তেল নিয়ে যেই তিনি বিশেষ দোয়া পাঠ করে ফুঁক দিতেন অমনি তা চলে আসতো তাঁর হাতের মুঠোয়। এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী তাঁর সামনে থাকুক কিংবা দূরে। একবার বাড়ির পুকুরপাড়ে কাজের লোক মোখলেসের চোখে গাছ কাটতে গিয়ে গাছের টুকরো ঢুকে গেল। বেচারা তো প্রায় বেঁহু হয়ে যাচ্ছিল যন্ত্রণায়। ঘটনা দেখে ইউসুফ তাড়াতাড়ি তাঁর মাকে জানাল ঘরে গিয়ে। ইউসুফের মা মাত্র তিন মিনিটের মাথায় হাতের তালুতে নিয়ে এলেন সেই কাঠের টুকরো। অদ্ভূত এই ঘটনা দেখে ইউসুফ দৌড়ে গেল পুকুরপাড়ে মোখলেস যেখানে কাতরাচ্ছিল বসে বসে। দিয়ে দেখে অবাক কান্ড। গামছা দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে মোখলেস বলছে, ‘ আল্লাহর শুকরিয়া, তিনি আমাকে রক্ষা করেছেন।’ 


চার.
যে আনন্দ ডানায় ভর দিয়ে বড় ভাইয়ের সাথে শহরে এসেছিল ইউসুফ তা মাত্র দুই দিনেই কষ্টময় এক কঠিন জীবনে পরিণত হলো। শহরের অভিজাত এলাকায় সুন্দর একটি ফ্লাট ভাড়া করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য যোগদানকারী প্রভাষক সাব্বির সোলায়মান। নিজের বেডরুমে একটি বেড আর কিছু আসবাবপত্র ছাড়া সমগ্র ফ্ল্যাটই খালি পড়ে আছে। গরম কাল হওয়ায় সুবিধা হলো রাতে ফ্লোরিং করেই ঘুমাতে পারল ইউসুফ।
‘বিছানা থাকলেও তো আমরা গরমের সময় এভাবে মাটিতে ঘুমাই’ বলে নিজের বেড খালি রেখেই মাটিতে শুয়ে পড়লেন প্রথম রাতেই সাব্বির সোলায়মান। ছোট ভাই ইউসুফকে বললেন খাটে ঘুমানোর জন্য। কিন্তু ইউসুফ এতটা বেয়াদব না যে বড় ভাইকে মাটিতে রেখে নিজে খাটের উপর ঘুমোবে আবা এতটা অবুঝও নয় যে নিজের খাট-বিছানা না আসা পর্যন্ত এভাবেই ফ্লোরিং করতে হবে। ইউসুফের কষ্টটা কিন্তু এই ফ্লোরিং করার জন্য নয় বরং একা থাকতে থাকতেই হাঁপিয়ে উঠল সে। বড় ভাই নিজেই রান্না করেন, ইউসুফ তাঁকে সহযোগিতা করে মাত্র। তিনি সকালে সাতটায় বেরিয়ে যান ব্রিফকেসটা হাতে নিয়ে। গেট-দরজা তালা দেওয়া থাকে সারাদিন। ইউসুফের ভাল লাগে না কিছুই। সারাদিন তার মন পড়ে থাকে গ্রামের পুকুর পাড়ে খেলার মাঠে। কদাচিৎ মনের কোণে ভেসে ওঠে ফারিয়ার ছবি। বড় ভাইয়ের বুকসেলফে প্রাপ্ত সবগুলো গল্প উপন্যাসের বই পড়ে শেষ করে ফেলল ইউসুফ মাত্র এক সপ্তাহে। এই শহরেই বড় বোন সানজিদা বেগমের বাসা। আগে শহরে এলে সেখানেই যেত ইউসুফ। কিন্তু এখন বাসা একা রেখে সেদিকে যাওয়ার মতো পরিবেশও পাচ্ছিল না। সব মিলিয়ে বিরক্তিকর একটি সপ্তাহ পার করতে না করতেই চলে এলো সেই সুযোগটি। সেদিন শুক্রবারে দুপুরের খাবার টেবিলেই বিষয়টি তুললেন সাব্বির।
‘কি রে, শহরে থাকতে কেমন লাগছে?’
‘ভাল’।
‘ভালই যদি লাগবে তো মুখটা এমন প্যাঁচার মতো করে রেখেছিস্ কেন? নিশ্চয়ই খারাপ লাগছে।’
‘আসলে একা একা ভাল লাগে না’।
‘তাহলে এক কাজ কর, বাড়ি গিয়ে মাকে নিয়ে আয়’।
‘সত্যি বলছেন?’ বড় ভাইকে ‘আপনি’ সম্বোধন করেই ডাকার রেওয়াজ ইউসুফদের পরিবারে। বাবা ও বড় ভাই এ দুজনকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করে ইউসুফ।
‘হ্যাঁ সত্যি বলছি। তুই বাড়িতে গিয়ে বলবি যে, এখানে তোর ভাল লাগে না আর ভাইয়ারও খুব অসুবিধা হচ্ছে থাকতে। দেখবি মা এমনিতেই চলে আসবে।’
পরদিন সকালে চিরচেনা সেই গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল ইউসুফ। 






পাঁচ.

‘মা, কোথায় তোমরা? আমি তোমাদের নিতে এসেছি’ বলেই বাড়িতে প্রবেশ করল ইউসুফ। ইউসুফের মা ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন। এ কয়দিন ছোট্র ইউসুফকে ছাড়া বেশ কষ্টে ছিলেন তিনি।
‘মা এবার তোমাদেরকে আমার সাথে যেতেই হবে, ভাইয়া বলে দিয়েছে’। মাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বলে চলল ইউসুফ।
‘হ্যাঁ যাবো, অবশ্যই যাবো। তোর বাবা যতই মানা করুক এবার আমাকে যেতেই হবে।’ ইউসুফের মায়ে কণ্ঠে দৃঢ় অঙ্গীকারের আভাস পেল ইউসুফ। মা কেন এমন জোর গলায় তার সাথে বড় ভাইয়ার কাছে শহরে চলে যেতে চাইছেন তা বুঝার মতো বয়স তখনো ইউসুফের হয়নি। এখানে মা-ছেলে দু’জনেই আবেগের কাছে বিলীন হয়ে গেল। রাতে ইউসুফের বাবা ঘরে ফিরেন অনেক দেরি করে। ততক্ষণে ইউসুফ ঘুমিয়ে পড়েছে। সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় ইউসুফকে ডাকলেন বাবা আরমান আলী।
‘তোমার ভাইয়ার বাসাটি দেখতে কেমন?’ মুখে মুচকি হাসি টেনে জানতে চাইলেন তিনি।
‘এক কথায় চমৎকার’ বলে ইউসুফ বাসার বিস্তারিত বিবরণ দিল ইউসুফ।
‘তোমার মা জেদ ধরেছেন, তোমার ভাইয়ার কাছে চলে যাবেন।’
‘আপনি যাবেন না, বাবা?’
‘আমি যাবো না এবং তোমার মাকেও আমি যথাসম্ভব বুঝানো চেষ্টা করেছি না যেতে।’ বাবার কথা শুনে ইউসুফের মনটা খারাপ হয়ে গেল। এ সময় হাতে চা নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন ইউসুফের মা।
‘আপনার কোন কথাই আমি আর শুনবো না। আমাকে যেতেই হবে।আমি বলি কি, আপনিও চলুন।’
‘সবাই চলে গেলে এই বাড়ির কি হবে?’
‘বাড়ি যেমন আছে থাকবে, ঘর তালা দিয়ে যাবো’।
‘তুমি যত সহজে বলতে পারছো কাজটা তত সহজ হবে না।’
‘তা আপনার যা খুশি তাই করেন, আমি কিন্তু সোলায়মানের কাছে যাবই, এই বলে দিলাম।’
‘ঠিক আছে ইউসুফ, তুমি তোমার মাকে আর যাবরিনকে নিয়ে চলে যাও। আমরা মানে আমি আর সিদ্দিক আপাতত বাড়িতেই থাকি।’ বাবার কথা শুনে ইউসুফের মনে যে কি আনন্দ বয়ে গেল তা কাউকে বুঝানোর নয়। কিন্তু সে জানলো না তার বাবার মনে কতটা বেদনা এসময় কাজ করছিল।

ইউসুফ তার মা ও পালিত ছোট বোন যাবরিনকে সঙ্গে নিয়ে পরদিনই শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। যাবরিনের চাচা মাওলানা আব্দুল হাসিম ইউসুফদের গ্রামের মসজিদের ইমাম ছিলেন। একদিন রাস্তায় ইউসুফের ভাই সিদ্দিকের সাথে তিনি যাবরিনের ব্যাপারে আলাপ করেন। সিদ্দিক বাড়িতে বাবা-মাকে বলে যে, মসজিদের ইমাম সাহেব তার ভাতিজিকে দত্তক দিতে চান। ইউসুফের মা এক কথায় রাজী হয়ে যান। মেয়েটি কত বড় কার মেয়ে ইত্যাদি খোঁজ নেওয়ার জন্য সিদ্দিককে দায়িত্ব দেন আরমান আলী। খোঁজ নিয়ে জানা যায় যাবরিনের মাকে তালাক দিয়ে আরেকটি বিয়ে করেছেন যাবরিনের বাবা। সৎ মা সব সময় যাবরিনের উপর অত্যাচার করে। অন্যদিকে যাবরিনের আসল মায়েরও বিয়ে হয়ে গেছে ইন্ডিয়ায়। সব মিলিয়ে ৩ বছরের এই শিশু কন্যাটির জন্য চাচা আব্দুল হাসিম খুবই কষ্ট পাচ্ছিলেন মনে মনে। এই ভাবে ইউসুফদের বাড়িতে যাবরিনের আগমন ঘটে। আরমান আলী যাবরিনকে নিয়ে একটি কবিতাও লিখেছিলেন। কবিতাটি ছিল এরকম- ‘যাবরিন, যাবরিন/ বাড়ি যাবে কোন্ দিন?/ বাড়ি আমি যাব না/ সৎ মা’র যাতনা/ ভাত দেয় খুব কম/ গাল বকে হরদম……’। সেই থেকে যাবরিন এ বাড়িরই একজন হয়ে যায়।

মা ও যাবরিনকে সঙ্গে নিয়ে শুক্রবার দিন সকালে বাসায় চলে আসে ইউসুফ। মোটামুটি চলার মতো জিনিসপত্রও সঙ্গে আনা হয়। তাদেরকে পৌঁছে দিতে সঙ্গে আসে সিদ্দিক আহসানও। অবশ্য দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরেই বাড়ির উদ্দেশ্যে আবারও রওয়ানা হয় সিদ্দিক। আর ইউসুফরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে নতুন জীবনের সন্ধানে। বড় ভাই সাব্বির সোলায়মান এখন অনেকটাই নিশ্চিত। মায়ের হাতের রান্না খাওয়া হয়নি নিয়মিত সে প্রায় এক যুগ। আর এখন, মায়ের হাতের রান্না প্রতিদিনের খাবার টেবিলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া আসার পাশাপাশি গোপনে দু-একটা টিউশনিও সেরে নিতেন সাব্বির সোলায়মান। জীবনের কাঠিন্য যে তার কাছে নতুন কিছু নয়। বলতে গেলে পুরো পরিবারের দায়িত্ব এখন তাঁরই হাতে। তাই বাড়তি আয়-রোজগার করা দরকার ছিল তাঁরও। নিজের সংসারটা গড়ার বয়সও তো হয়ে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হওয়ার কারণে চারদিক থেকেই প্রস্তাব আসতে শুরু করলো। (চলবে) 


ছয়. 
ইউসুফ আদনানের নাগরিক জীবন (!) সুখে শান্তিতে কাটতে শুরু হলো। ঘরে বসে বসে বড় ভাই সাব্বির সোলায়মানের বুক সেলফে রাখা শতাধিক উপন্যাসের বই পড়ে শেষ করার পর এখন বিভিন্ন বইয়ের দোকানের দিকেই তার দৃষ্টি। হুমায়ুন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, সুনীল গঙ্গোপধ্যায় কিংবা সমরেশ মজুমদারের নাম দেখলেই হলো। আর সেবা প্রকাশনীর তিন গোয়েন্দা মাসুদ রানা সিরিজের বিষয়টি তো রয়েছেই। বইগুলো তার কিনতেই হবে। কিন্তু পকেটের দৈন্যতার কারণে সবগুলো বই সময় মতো কেনা সম্ভব হতো না। বড় ভাই সাব্বির সোলায়মান শুক্র বা শনিবারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির দিন বাজারে যেতেন ইউসুফকে সঙ্গে নিয়েই। সেই সুবাদে সপ্তাহের বাকি দিনগুলো একা একা বাজার করতে যেত ইউসুফ। মাছ-মাংস আর তরি তরকারি তো প্রায় প্রতিদিনই কিনতে হয়। বাজার করার অভ্যাসটা অবশ্য ইউসুফের আরো আগে থেকেই হয়ে গিয়েছিল। গ্রামে থাকতেই এ গুরু দায়িত্বটা তার উপর পড়ে গিয়েছিল শেষ দিকে। বিশেষত: মেজ ভাই সিদ্দিক আহসান কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বাড়ির প্রতি অমনোযোগী হয়ে যাওয়ায় ইউসুফ এ দায়িত্বটা পায়। আর এখন তো এই সেক্টরের ম্যানেজার হিসেবেই সে দায়িত্ব প্রাপ্ত! তো গল্পের বই কেনার জন্য এই অপকর্মটি করা ছাড়া তার আর কোন পথ ছিল না। তাই ২৫০ টাকার মাছকে ৩০০ টাকা কিংবা ৫০ টাকা সবজিকে ৬০ টাকা বানিয়ে দেওয়া তার নিত্যদিনের কাজে পরিণত হয়। যেন এটা তার একটা ব্যবসা! ২৫০ টাকার মাছ কিনে বাসায় তা ৩০০ টাকা বিক্রি করছে। নীট প্রফিট ৫০ টাকা! গল্প-উপন্যাসকে গ্রাম্য ভাষায় বলা হয় ‘আউট বই’। ‘আউট’ ইংরেজি শব্দটি বাংলা ভাষায় এত বেশি ব্যবহৃত হয় যে, এটাকে আর বিদেশী ভাষা বলে মনেই হয় না। যেমন ‘চেয়ার’ অর্থ ‘কেদারা’ হলেও সেটা অনেকেই জানে না তেমনি ‘আউট’ বললেই মানুষ বুঝতে পারে, ‘বাহির’ বললে অনেক সময় বুঝতেও পারে না বিষয়টা কি? যদি বলা হতো ‘বাহির বই’ তাহলে কি বুঝা যেত? নিশ্চয়ই না। এরকম অনেক ইংরেজি শব্দকেই বাঙালিরা বাংলা মনে করতে শুরু করে। ইউসুফের বড় ভাই সাব্বির সোলায়মান একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস মিস করার কারণে রিক্সায় উঠে বললেন, ড্রাইভার বিশ্ববিদ্যালয়ে চলো। ড্রাইভার বেচারা এলোমেলো চলতে শুরু করলে তিনি পথ নির্দেশ দিয়ে যখন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলেন তখন ড্রাইভার ভ্রু কুঁচকে বলল, ভার্সিটি আসবেন সেটা আগে কইলেই পারতেন! বিশ্ববিদ্যালয় না চিনলেও ‘ভার্সিটি’ সম্পর্কে রিক্সার ড্রাইভারটি ভালই অবগত। 

পাঠ্য বইয়ের তালিকা বহির্ভূত সকল বইকেই লোকে ‘আউট বই’ হিসেবে জানতো আর ইউসুফ আদনান কি না পড়ে থাকলো সেটা নিয়ে। তার মানে সে কি আবার লেখা পড়া থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে? ভাবনা চিন্তাটি বার কয়েক সাব্বির সোলায়মানের মাথায় আসলেও তিনি কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। বিশেষ করে গ্রামের স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ছে। এখন বছরের মাঝখানে তো আর কোন স্কুলে ভর্তি করানো যাবে না, তাই নিরবতা পালন করাটাকেই তিনি বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করছিলেন। তাছাড়া বাবা আরমান আলীর এ বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত সেটাও জানা দরকার। তিনি তো আর গ্রামের বাড়ি ছেড়ে এলেন না। বাজার করা, আউট বই পড়া আর ঘুমানো ছাড়া ইউসুফের আপাতত আর কোন কাজ নেই। অবশ্য বাসার পাশেই মসজিদ হওয়াতে একটা সুবিধা ছিল নিয়মিত মসজিদে যেত ইউসুফ। প্রতিদিন ফজরের সময় যাওয়ার অভ্যাস ছিল গ্রামে থাকতেই। অন্যান্য ওয়াক্তেও ঠিক সময় মতো হাজিরা দিত। এই বয়সের ছেলেরা সাধারণত নিয়মিত নামাজ পড়তে পারে না, ইউসুফ সেটা পারতো। গ্রামে থাকতে অবশ্য প্রায় দিনই বিকেলের নামাজ মিস হয়ে যেত। আসর আর মাগরিবের সময়টা খেলাধুলার কারণে মিস হতো। এশার নামাজ মিস হতো কারণ ছাড়াই। সন্ধ্যার পর ঘর থেকে একা বের হওয়াটা বেশ কঠিন ছিল। ইচ্ছে করলে অবশ্যই ঘরেও নামাজ পড়া যায়। কিন্তু সেই ইচ্ছেটা হতো না অনেক সময় ইউসুফ আদনান। শহরে আসার পর আর কোন কাজ না থাকায় তাই মসজিদের সাথে ভাল একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল। পত্রিকা পড়া, গল্পের বই পড়ার পাশাপাশি তাই মাঝে মধ্যে কুরআন শরীফ নিয়েও বসতে শুরু করলো ইউসুফ। সব মিলিয়ে দিনকাল বেশ ভালই কেটে যাচ্ছিল তার। ইউসুফ বাসার যে রুমটিতে থাকতো ওটাই ছিল তাদের বাসার ফ্যামিলি ড্রয়িং রুম। একপাশে সোফাসেট, মাঝ খানে চেয়ার টেবিল আর অপর পাশে ছোট্ট একটি খাটিয়া। ইউসুফ জানতো না তার এখানকার সকল কার্যক্রম কেউ একজন আড়াল থেকে নিয়মিত দেখতো। ড্রয়িংরূমের জানালার কালো গ্লাসে পর্দা টর্দা টানানো ছিল না। ভিতর থেকে কিছু দেখা না গেলেও বাইরে থেকে তা স্পষ্টই দেখা যেত। আর সেই কাজটিতে জড়িয়ে পড়ে পাশের বাসার একটি কিশোরী। ইউসুফ ঘুর্ণাক্ষরেও সেটা জানতে পারে না। (চলবে)



সাত. 
এক বিকেলে বাসার ছাদে দাঁড়িয়ে থেকে কি যেন ভাবছিল ইউসুফ। হয়তো বা নিজের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। ঠিক এমন সময় তাঁর দৃষ্টিগোচর হলো পাশের বাসার ব্যালকনি থেকে তার দিকে তাকিয়ে আছে দু’টি নজর কাড়া চোখ। অসম্ভব রকমের এক আকর্ষণ রয়েছে সেই চাহনীতে। চোখ সরাতে পারলো না ইউসুফ। কেন জানি তার মনে হলো মেয়েটি তার সাথে কথা বলছে। কি বলতে চাইছে? এমন করে তাকিয়ে আছে কেন ওই মেয়েটি? ও কি ইউসুফকে ওর ভালবাসা জানাতে চায়? ভাবতে গিয়ে নিজকে সামলে নিল ইউসুফ। এসব আজে-বাজে কথা কেনই বা তার মনে আসছে। দ্রুত বাসায় চলে গেল সে। মাগরিবের আযান হয়ে যাওয়ায় অযু করে মসজিদের দিকে রওয়ানা দিল। মেইন গেট থেকে পার হতেই হঠাৎ করে তার সামনে আবারও দেখা দিল সেই চোখ জোড়া। এ কি এত সুন্দর মেয়েটি! ইউসুফের এত কাছে দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটি যে হাত বাড়ালে ছোঁয়া যাবে। অপলক তাকিয়ে আছে তার দিকে যেন কিছু বলতে চায়। ইউসুফ হন হন করে হেঁটে চলল সামনের দিকে। পেছন থেকে ভেসে আসলো ‘খিল খিল’ শব্দের হাসি। সেই হাসি ইউসুফের হৃদয় জগতে বাজতে থাকলো অনেক্ষণ। মাগরিবের নামায শেষ হলো। লোকজন বেরিয়ে যাচ্ছে মসজিদ থেকে। ইউসুফ বসে আছে, ভাবছে দু হাত উপরে তুলে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করবে। একটু আগে যে মেয়েটির সাথে দেখা হলো ওই মেয়েটিকে আল্লাহ যেন তার জীবন সঙ্গী হিসেবে কবুল করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাত উঠালো না সে। তার কেন জানি মনে হলো মসজিদে বসে এই দোয়াটা করা ঠিক হবে না। কারণ বিয়ের পূর্বে ‘ভালবাসা’ পাপ! সে উঠে দাঁড়াল। পেছনের বক্সে রাখা দু’দিন আগের কেনা জুতো জোড়া খুঁজতে লাগল। নেই, ইউসুফ এদিক ওদিক সবদিকে খঁজে দেখল। কোথাও তার জুতো নেই। মসজিদ থেকে জুতো চুরির ব্যাপারটি ইউসুফ আদনান গ্রামে থাকতেই শুনেছিল। একবার তার মেজ ভাই সিদ্দিক আহসান মজা করে বলেছিল, মসজিদে সেজদায় যাওয়ার পর সবাই বলে ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা’ আর কিছু লোক (চোরেরা) কেবল বলতে থাকে ‘কোন্ জোড়া ভালা- কোন্ জোড়া ভালা?’ এরা নাকি মানুষকে সিজদারত অবস্থাতে রেখেই দামী ও সুন্দর দেখে বাছাই করে জুতো গুলো নিয়ে উধাও হয়ে যায়। আবার ফুটপাতে নিয়ে বিক্রি করে।

মসজিদের বড় গেট পর্যন্ত খালি পায়ে হেঁটে গেল ইউসুফ। তার বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। বড় ভাই সাব্বির সোলায়মান এই জুতো জোড়া তাকে কিনে দিতে চাননি। সে অনেকটাই জোর করে কিনিয়েছিল। এখন আবার জুতো কেনার কথা সে কি করে বলবে? মেইন গেটে আরো ৬ জনকে খালি পায়ে পায়চারি করতে দেখা গেল। ইউসুফও তাদের সঙ্গী হয়ে গেল ততক্ষণে। বাকি ৬ জনই পূর্ণ বয়স্ক লোক। তাই তারাও একবার করে ইউসুফের জন্য আফসোস করল। সবাই খালি পায়ে রওয়ানা হলেন মসজিদ থেকে। পরদিন ইউসুফকে আরেক জোড়া জুতো কিনে দিলেন বড় ভাই সাব্বির সোলায়মান। জুতো চুরি হওয়ার ঘটনায় তিনি কোন মন্তব্যই করলেন না। অথচ ইউসুফের মনে হয়েছিল তিনি বকা দিবেন এবং এ মাসে অন্তত আর নতুন জুতো কিনে দিবেন না। নতুন জুতো কিনে দিয়ে তিনি ইউসুফকে কেবল একটি উপদেশই দিলেন। বললেন, এখন থেকে নামাযে গেলে পুরনো স্যান্ডেলটা পরেই যাবে। মসজিদে দামী জুতো নিয়ে যাওয়া ঠিক না। ইউসুফ ভেবেছিল মসজিদে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারেন। কিন্তু সেটা ঘটলো না। আসলে ছোট থেকে বড় ভাইকে কাছে না পাওয়ার কারণে তাঁর প্রতি একরকম শ্রদ্ধা ও ভীতি কাজ করতো ইউসুফের মনে। বড় ভাইয়ের সাথে তাই প্রাণ খুলে কথা বলতে পারতো না। কিন্তু ধীরে ধীরে তার কাছে মনে হতে লাগলো বড় ভাই আসলে তাকে খুবই ¯স্নেহ করেন। তবে সেই মসজিদের বড় গেট পর্যন্ত খালি পায়ে হেঁটে গেল ইউসুফ। তার বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। বড় ভাই সাব্বির সোলায়মান এই জুতো জোড়া তাকে কিনে দিতে চাননি। সে অনেকটাই জোর করে কিনিয়েছিল। এখন আবার জুতো কেনার কথা সে কি করে বলবে? মেইন গেটে আরো ৬ জনকে খালি পায়ে পায়চারি করতে দেখা গেল। ইউসুফও তাদের সঙ্গী হয়ে গেল ততক্ষণে। বাকি ৬ জনই পূর্ণ বয়স্ক লোক। তাই তারাও একবার করে ইউসুফের জন্য আফসোস করল। সবাই খালি পায়ে রওয়ানা হলেন মসজিদ থেকে। পরদিন ইউসুফকে আরেক জোড়া জুতো কিনে দিলেন বড় ভাই সাব্বির সোলায়মান। জুতো চুরি হওয়ার ঘটনায় তিনি কোন মন্তব্যই করলেন না। অথচ ইউসুফের মনে হয়েছিল তিনি বকা দিবেন এবং এ মাসে অন্তত আর নতুন জুতো কিনে দিবেন না। নতুন জুতো কিনে দিয়ে তিনি ইউসুফকে কেবল একটি উপদেশই দিলেন। বললেন, এখন থেকে নামাযে গেলে পুরনো স্যান্ডেলটা পরেই যাবে। মসজিদে দামী জুতো নিয়ে যাওয়া ঠিক না। ইউসুফ ভেবেছিল মসজিদে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারেন। কিন্তু সেটা ঘটলো না। আসলে ছোট থেকে বড় ভাইকে কাছে না পাওয়ার কারণে তাঁর প্রতি একরকম শ্রদ্ধা ও ভীতি কাজ করতো ইউসুফের মনে। বড় ভাইয়ের সাথে তাই প্রাণ খুলে কথা বলতে পারতো না। কিন্তু ধীরে ধীরে তার কাছে মনে হতে লাগলো বড় ভাই আসলে তাকে খুবই ¯স্নেহ করেন। তবে সেই ¯স্নেহ ভালবাসার প্রকাশ ঘটাতে চান না সহজে।

এইভাবে চলে যাচ্ছিল ইউসুফের নাগরিক জীবন। একদিন দুপুর বেলা কলিং বেলের আওয়াজ শুনে ইউসুফ দরজা খুলতে গেল। দরজাটা খুলেই অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে তার বাবা আরমান আলী দাঁড়িয়ে আছেন। এক হাতে বাবার সেই প্রিয় লাঠি অপর হাতটি বুলাচ্ছেন তার আধা পাকা দাঁড়ি আর গোঁফে। ইউসুফ সাধারণত ফ্যামিলি মেম্বারদের কাউকে সালাম করে না। এই বদ অভ্যাসটি কিভাবে যে হয়েছিল কে জানে! তবে আরমান আলী যেহেতু ইউসুফের স্কুলের শিক্ষক, তাই তাঁকে মাঝে মাঝে সালাম করতেই হতো। অবশ্য বাবাকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখার পর ইউসুফ আনন্দ আর আবেগে আপ্লুত হয়ে গিয়ে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলেই বাসার ভিতর দিকে ছুটল । ‘মা, দেখে যাও কে এসেছেন’ বলতে বলতে মায়ের ঘরে গিয়ে ঢুকলো সে। আরমান আলী তখন ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করে পুরো বাসাটি পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করছিলেন। তাঁর সাথে গ্রাম থেকে এসেছিল দু’জন লোক। তিনি ওদেরকে কেন সাথে করে নিয়ে এসেছেন তা বুঝতে পারলেন না ইউসুফের মা। তাই তিনি ইউসুফকে বললেন, তোর বাবাকে ভিতরে আসতে বল। (চলবে)



৮.
‘বাবা, আপনি ভিতরে আসুন। মা ডাকছেন।’ বলতে বলতে সদর দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছিল ইউসুফ। তখনই দেখতে পেল গ্রাম থেকে আসা সেই দু’জন লোক প্রচুর জিনিসপত্র ধরাধরি করে বাসায় নিয়ে আসছে। দরজা বন্ধ না করে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকালো সে। বাবা আরমান আলী গোঁফে হাত বুলিয়ে চির পরিচিত সেই মুচকি হাসিটি দিয়ে বললেন, ‘এসব তোমার বইপত্র যা বাড়িতে রেখে এসেছিলে। তোমার পড়াশোনা কি এখন বন্ধ?’
‘জি না, মানে.. .. ’ বলে আমতা আমতা করছিল ইউসুফ।
‘তুমি কি শহরের কোন স্কুলে ভর্তি হয়েছো?’
‘জ্বি না।’
‘তাহলে পড়াশোনা চালিয়ে যাও। শিক্ষানিকেতন থেকেই পরীক্ষা দেবে।’ শিক্ষানিকেতন ইউসুফের সেই স্কুলের নাম যেখানে সে ইতোপূর্বে ভর্তি হয়েছিল নবম শ্রেণীতে। 
‘কিন্তু বাবা, আমার বইপত্র তো এত বেশি ছিল না। এসব কি নিয়ে এসেছেন আপনি?’ প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ইউসুফ তার বাবার দিকে।
আবারও মুচকি হাসলেন আরমান আলী। বললেন, ‘বাড়ির অন্যান্য জিনিসপত্র গুলো কি এখানে কোনই কাজে লাগবে না?’
‘তা লাগবে, কিন্তু.. ..’
‘কিন্তু এগুলোকে ফেলে আসতে হয় তাইতো!’
‘আপনি ঠিক কি বলতে চাইছেন বাবা? আমি বুঝতে পারলাম না।’
‘বলতে চাইছি যে জিনিসপত্র পুরনো হলে সব ফেলে দিতে হয়, তাই না?’
‘হ্যাঁ তা দিতে হয় যদি ওসবের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়।’
‘তাহলে আমারও প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে তোমাদের কাছে, নাকি নষ্ট হয়ে গেছি?’ মুখে হাসি টেনে বললেন আরমান আলী। এবার ইউসুফের আর বুঝতে বাকি থাকলো না যে তার বাবা স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য চলে এসেছেন। 
‘এসব কি বলছেন বাবা? আমরা তো আপনাকে রেখে আসতে চাইনি। আপনি ইচ্ছে করেই থেকে গিয়েছিলেন।’
‘তা থেকে গিয়েছিলাম, কিন্তু এই বুড়ো বাবাকে আনার জন্য তো আর কোন উদ্যোগও তোমাদের ছিল না। তাই আমি নিজেই চলে এলাম!’
‘খুব ভাল করেছেন বাবা। চলেন ভিতরে চলেন। মা খুব খুশি হবেন।’ 
পর্দার আড়াল থেকে ইউসুফদের সব কথা শুনছিলেন হাফসা বেগম। আরমান আলী ভিতরে প্রবেশ করতেই তিনি মনে মনে প্রচন্ড খুশি হলেও মুখে ভাব নিয়ে বললেন, ‘এলেন শেষ পর্যন্ত!’ আমি তো ভেবেছিলাম.. ..’
‘কি ভেবেছিলে, আমাকে ছাড়া বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবে?’
‘না, তা ভাবতে যাবো কেন? ভেবেছিলাম আপনার জিদ কি আর এত সহজে শেষ হবে! তা আপনি তো চলে আসলেন, বাড়ির কি করলেন?’
‘কেন সিদ্দিক আহসানকে রেখে এসেছি।’
‘সে কি, ও একা একা থাকবে কি করে?’
‘একা থাকছে না, বাড়িতে এক গরীব পরিবার এসেছে। থাকবে আর বাড়ির দেখাশোনা করবে। বাড়ির পাহারাদার বলতে পারো।’
‘সিদ্দিক কি ওদের সাথে থাকতে পারবে?’
‘ওদের সাথে থাকবে কেন? সে তো আমাদের ঘরটাতেই থাকবে। খাওয়া-দাওয়াটা ওদের সাথে করতে হবে এই আর কি!’
‘ওই হলো একই কথা। ওকে নিয়ে আসলেই পারতেন।’
‘ওর নতুন চাকরি হয়েছে, এখনই নিয়ে আসাটা কি ঠিক হবে?’
‘চাকরি মানে?’
‘ও তোমাদের তো বলাই হয়নি সিদ্দিক শিক্ষানিকেতন স্কুলে টিচার হিসেবে জয়েন করেছে।’
‘সে কি, মাত্র আইএ পাস করেই শিক্ষক!’
‘হ্যাঁ, দেখতে হবে না ছেলেটা কার! তা সাব্বির সোলায়মান কি এখনও ভার্সিটিতে আছে?’
‘হ্যাঁ, ওদের তো বিকেল ৫টা পর্যন্ত অফিস। সন্ধ্যা নাগাদ বাসায় এসে পৌঁছাবে।’
‘ঠিক আছে, আমি তাহলে ততক্ষণ একটু জিরিয়ে নেই। আমার জন্য কি একটু জিরানোর ব্যবস্থা হবে তোমাদের এই রাজ প্রাসাদে?’
‘চলেন তাহলে আপনার বেডরুমে, যেখানে আপনার স্ত্রী এতদিন আপনার অপেক্ষায় ছিল।’
আরমান আলী চলে গেলেন তাঁর স্ত্রীর বেডরুমে। পোষাক চেঞ্জ করে বিছানায় গড়াগড়ি দিতে লাগলেন। 

পরদিন শুক্রবার। দুপুরের ডাইনিং টেবিলে সবাই একসাথে খেতে বসেছেন। খাবার টেবিলেই আরমান আলী সাব্বির সোলায়মানের সাথে বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলছিলেন। হঠাৎ করে চলে আসলো ইফসুফ আদনানের প্রসঙ্গ। ‘ইউসুফের ব্যাপারে কিছু ভেবেছো সাব্বির?’ জানতে চাইলেন আরমান আলী।
‘ইউসুফের কোন্ ব্যাপারে?’ না বুঝার ভান করে পাল্টা প্রশ্ন সাব্বির সোলায়মানের।
‘পড়াশোনা ছাড়া কি ওর আর কোন ব্যাপার আছে বা থাকার কথা?’
‘জ্বি, আমি বুঝতে পেরেছি। আসলে আমি এ ব্যাপারে এখনও কিছু ঠিক করিনি।’
‘ঠিক কর নি মানে ভেবেছো?’
‘জ্বি তা ভেবেছি তো বটে। তবে এখন তো বছরের মাঝামাঝি সময়। কোথাও ভর্তি করানো যাবে না।’
‘ও তো ক্লাস টেনের ছাত্র, ভর্তি করানো গেলেও তো এক ইয়ার খোয়াতে হবে।’
‘হ্যাঁ তা খোয়াতে হবে।’
‘তাহলে আগামী বছরের শুরুতে ভর্তি করা হলে আরেক ইয়ার নষ্ট হবে।’
‘জ্বি, তাতো হবেই। কিন্তু বাবা এ ব্যাপারে আপনার চিন্তা ভাবনা কি?’
‘তুমি যখন সব তোমার দায়িত্বে নিয়েই এসেছো, এখন সব কিছু তোমার চিন্তা ভাবনাতেই হওয়া উচিত।’ স্বাভাবিক কণ্ঠেই বললেন আরমান আলী। কিন্তু সাব্বির সোলায়মান বুঝতে পারলেন তাঁর বাবা কত কষ্ট পেয়েছেন এ বিষয়টাতে। তাই মনটা খারাপ হয়ে গেল তাঁর। 
‘বাবা, আপনি এমনভাবে বলবেন না। আমি আসলে বাস্তব পরিস্থিতিকেই বড় করে দেখেছি। আপনি রিটায়ার্ড। আমার চাকরী হয়েছে। কিন্তু আমার পক্ষে শহরে থেকে ওখানে আপনাদের কোনভাবে হেল্প করাটা অনেক কঠিন হতো।’ মাথা নিচু করে বললেন সাব্বির সোলায়মান।
‘সে যাই হোক, যা হবার তা তো হলোই। আমিও চলে এলাম তোমার উপর বোঝা হয়ে। যেটা বলছিলাম, ইউসুফের শিক্ষা জীবন থেকে দু’টি বছর কমিয়ে দেওয়া তো ঠিক হবে না।’
‘বাবা, এক কাজ করলে কেমন হয়?’
‘কি?’
‘ইউসুফ তার স্কুল থেকেই আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলে কেমন হয়? আপনি তো আছেনই। আর আমরা তো সবাই এসএসসি পরীক্ষা দিয়েই ছাত্র জীবন শুরু করেছি।’
‘এটা আমিও ভেবেছি। কিন্তু ইউসুফের ইচ্ছা কি?’ ইফসুফ আদনান খেতে খেতে বাবা ও বড় ভাইয়ের কথা শুনছিল। বুঝতে পারলো এবার তার পালা।
‘তুই কি ভাবছিস ইউসুফ?’ জানতে চাইলেন সাব্বির সোলায়মান। 
‘আমি আবার কি ভাববো?’ আমতা আমতা করে বলল ইউসুফ আদনান। 
‘তুমি কি আমাদের কথা শুনতে পাওনি?’ বললেন আরমান আলী।
‘জ্বি, শুনেছি।’
‘তাহলে বল, আগামী বছর মেট্রিক পরীক্ষা দিতে পারবে কি না!’
‘পরীক্ষা তো দিতেই হবে, যেহেতু আমি আগামী বছরের পরীক্ষার্থী।’
‘কোর্স কতটুকু কমপ্লিট করেছো?’
‘তেমন না।’
‘তাহলে পরীক্ষা দিলে তো এ প্লাস পাবে না।’
‘সমস্যা নেই, এ পেলেও চলবে। কিন্তু সমস্যা হলো আমি তো এর আগে কোনদিন পরীক্ষা দেইনি। তাই পরীক্ষা ভীতি কাটানোর দরকার।’ ইউসুফ তার মনের কথাটি বলতে পেরে একটু হালকা হল। তার কথা শুনে বাবা ও বড় ভাই দুজনেই একটু ভেবে নিলেন। এমনটা তারা চিন্তা করেননি।
‘কেন, আমি এবং সিদ্দিক তো প্রথম পরীক্ষা হিসেবে এসএসসির টেস্ট পরীক্ষাই দিলাম। তুইও দিবি।’ বললেন সাব্বির সোলায়মান।
‘নাকি প্রি-টেস্ট দিয়ে শুরু করতে চাও তুমি?’ আরমান আলী আগ্রহ নিয়ে বললেন।
‘জ্বি বাবা, আমার মনে হয় প্রি-টেস্ট দিয়েই শুরু করি।’
‘ঠিক আছে তাই হবে। প্রি-টেস্ট তো আরো দুই মাস পর। এখন থেকে প্রস্তুতি নাও।’
ইউসুফ আদনান আবার পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে উঠল। (চলবে) 



৯. 
দুইমাস পর ইউসুফ তার প্রয়োজনীয় বইপত্র আর জামা কাপড় নিয়ে নানা বাড়িতে গিয়ে উঠল। নিজেদের বাড়িতে থাকা যেত কিন্তু ইউসুফের মা হাফসা বেগম সেটা মানতে রাজী হলেন না। ইউসুফের নানা-নানী নেই। নানী মারা গেছেন ও ছোট থাকতেই আর নানাও কিছুদিন আগে মারা গেলেন। এখন বড় মামা, মেজ মামা আর ছোট মামা এই তিন জনের দু’টি পরিবার নানা বাড়িতে। বড় মামা ও মেজ মামার পৃথক সংসার, ছোট মামা থাকেন বড় মামার সাথেই। এখনও বিয়ে শাদী করেননি, করলে হয়তো তিনিও আলাদা সংসার করবেন। 

ইউসুফ যেদিন বড়মামার বাড়িতে গিয়ে উঠল তার পরদিন থেকেই স্কুলে প্রি-টেষ্ট পরীক্ষা শুরু হল। যথারীতি সেও গিয়ে পরীক্ষার হলে উপস্থিত হলো। ইউসুফকে হেডস্যার ডেকে নিলেন তার অফিসে। পরামর্শ দিলেন ভাল করে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। জানতে চাইলেন এর আগে কোন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে কি না! ইউসুফ জানাল ‘না’। 
জীবনের প্রথমবার সে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। স্কুলের একটি শ্রেণী কক্ষে ইউসুফ তার আসন খুঁজে পেল। একই সাথে স্কুলের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষাও চলছিল। তাই একই বেঞ্চে বিভিন্ন শ্রেণীর ছাত্ররা বসে পরীক্ষা দিচ্ছিল। ইউসুফের ঠিক ডান পাশে বসেছিল ক্লাস সেভেনের ছাত্র জাহিদ, বাম পাশে ক্লাস নাইনের জনি। ওদের সাথে ইউসুফের কোন পূর্ব পরিচয় ছিল না। যেহেতু সে স্কুলে ক্লাস নাইনে রেজিস্ট্রেশন করার পর থেকেই অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু ওরা ঠিক চিনতো তাকে। তবুও সিটে বসার পর তার বাম পাশ থেকে জনি বলল, ‘ভাইয়া কি আরমান আলী স্যারের ছেলে?’
‘হ্যাঁ, তুমি কি করে চিনলে?’ আমতা আমতা করে জবাব দিল ইউসুফ।
‘বারে, আপনাকে স্কুলের সকলেই চিনে।’ ও পাশ থেকে দ্রুত জবাব দিল জাহিদ। 
‘আমাদের ভাগ্য খুবই ভাল, আপনি আমাদের হেল্প করতে পারবেন।’ জনির কথা শুনে ইউসুফ ঠিক বুঝতে পারল না ওরা কোন্ বিষয়ের হেল্প চাইছে। তবুও বলল, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।’

ঘন্টা পড়ার সাথে সাথে স্যার যথারীতি খাতা ও প্রশ্ন পত্র দিয়ে গেলেন। ইউসুফের পিঠ চাপড়ে স্যার বলে দিলেন, ‘গুড লাক ইউসুফ। তুমি এবার আমাদের স্কুলকে অনেক উপরে নিয়ে যেতেই এসেছো।’
‘ঠিক বুঝলাম না স্যার?’ ইউসুফ জানতে চাইল স্যারের কাছে। এই স্যারের সাথে তার ছোট বেলা থেকেই পরিচয় আছে। ইংরেজি স্যার হিসেবে স্কুলে পরিচিত। নাম মোস্তাফিজুর রহমান। 
‘বুঝবে ইউসুফ, বুঝবে। এবার তো প্রি-টেষ্টে তুমিই ফার্স্ট হতে এসেছো। এর পর বাকি থাকলো টেষ্ট। তারপরই আমাদের স্কুল থেকে প্রথম এ প্লাস পাওয়ার সৌভাগ্য তুমি অর্জন করবে নিশ্চয়ই।’
‘দোয়া করবেন স্যার।’ ইউসুফ প্রশ্ন পত্র পাঠে মনোযোগী হলো।

প্রায় দুই সপ্তাহ পর ইউসুফ আবার শহরে ফিরে এলো। কিছুদিন পর পরীক্ষার ফলাফল বের হলে দেখা গেল সকলের ধারণাই ঠিক। ইউসুফ স্কুলের ৫৩ জন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে প্রথম হয়েছে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে। এত কম পড়াশোনা করে কিভাবে এমন রেজাল্ট করতে পারলো তা ইউসুফ নিজেও বুঝতে পারছিল না। কারণ তার দেখা মতে তার সাথে অন্য যারা পরীক্ষা দিয়েছে তারা পরীক্ষা শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পড়েছে। এমন কি শেষ পর্যন্ত নকলের আশ্রয় নিয়েছে। কিংবা ডেক্স টেবিলে আগেই বিভিন্ন শর্টকাট আনসার লিখে রেখেছে। অথচ ইউসুফের প্রস্তুতি মাত্র দুই মাসের। নানা বাড়িতে থাকা অবস্থায় খুব একটা রিভিশনও দেওয়া হয়নি। একটা দুইটা প্রশ্নের উত্তর দেখতে দেখতেই রাতের পড়ার শেষ করে দিত ইউসুফ। সকালে পড়ায় বসতেই পারতো না। এমন অবস্থায় কি করে এত ভাল রেজাল্ট হয়ে গেল! ইউসুফ আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাল। আরমান আলী বুঝতে পারলেন তাঁর এই ছেলেটিও নিশ্চয়ই তাঁর মুখ উজ্জল করবে বড় ছেলে সাব্বির সোলায়মানের মতো। 

এর কিছুদিন পর শুরু হলো টেষ্ট বা নির্বাচনী পরীক্ষা। এবার ইউসুফ গিয়ে উঠলো তাদের গ্রামের বাড়িতে। মামার বাড়িতে না ওঠার কারণ হিসেবে যুক্তি দাঁড় করালো ওখান থেকে স্কুল অনেক দূরে। সহজে রিক্সা গাড়ি পাওয়া যায় না। বাড়িতে তখন সিদ্দিক আহসান ছিল আশ্রিত সেই গরীব লোকদের সাথে। গরীব লোকটি শ্রমিক ছিল, প্রতিদিন রুটি রুজির তাগিদে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত। বিকালে বাজার সওদা করে নিয়ে আসতো। সিদ্দিক আহসান আলাদা করে কিছু টাকা পয়সা দিয়ে রাখতো আর ওদের সাথেই খাওয়া দাওয়া করতো। ইউসুফ আদনান ইদানিং শহরের বাসিন্দা হয়ে যাওয়ার ফলে গ্রামের এই পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারল না । প্রথম দিন ভাল মতো পরীক্ষা দিলেও দ্বিতীয় দিনই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গেল। ডায়রিয়া থেকে ডিসেন্ট্রি হয়ে গেল। পরীক্ষার সূচিতে দু’দিন বিরতি ছিল। ইউসুফ সেই সুযোগে শহরের বাসায় চলে গেল। এর পর স্কুলের পার্শ্ববর্তী বাজারের একটি হোটেলে ইউসুফের জন্য রুম বরাদ্ধ হলো। অসুস্থ থাকা অবস্থাতেই এখান থেকে সে টেষ্ট পরীক্ষা সম্পন্ন করলো। টেষ্ট পরীক্ষার রেজাল্ট প্রি-টেষ্টের মতো এতটা ভাল না হলেও মোটামুটি ভালই হলো। সম্মিলিত রেজাল্ট শীটে ১৭তম স্থান অধিকার করলেও শিক্ষকেরা উৎসাহ দিতে ভুললেন না। সকলেই ধরে নিলেন অসুস্থতার জন্য এবার ইউসুফ ফার্স্ট হতে পারলো না। 

মাধ্যমিক বা এসএসসি পরীক্ষাই হচ্ছে শিক্ষা জীবনে সাফল্যের সিঁড়িতে পদার্পণের প্রথম ধাপ। সেই ধাপে এসে পৌঁছে গেল ইউসুফ আদনান। পরীক্ষার রুটিন পাওয়ার পর থেকেই বাসায় আলোচনার বিষয় একটাই, ইউসুফ পরীক্ষা চলাকালীন সময় কোথায় থাকবে? পরীক্ষা কেন্দ্রটি স্থানীয় উপজেলা সদরের পাশে সরকারি স্কুলে। পুরো উপজেলায় একটাই পরীক্ষা কেন্দ্র। ইউসুফদের বাড়ি থেকে সেটা অনেক দূর। একইভাবে অনেক দূরে ইউসুফদের নানা বাড়ি থেকেও। অবশেষে ইউসুফের বাবা আরমান আলী ঠিক করলেন তাঁর বন্ধু আব্দুস সামাদ সাহেবের বাড়িতেই পাঠিয়ে দেবেন ইউসুফকে। যথারীতি আলাপ করে নিলেন সামাদ সাহেবের সাথে। সামাদ সাহেব তো এক কথায় রাজী। 
‘আরে আপনার ছেলেকে আকাশে তুলে রাখবো আমরা, আপনি একদম ভাববেন না।’ সাফ জানিয়ে দিলেন সামাদ সাহেব। (চলবে) 



১০.
নির্ধারিত তারিখের দু’দিন আগেই আরমান আলী ইউসুফকে সাথে নিয়ে হাজির হলেন সামাদ সাহেবের বাড়িতে। বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন রিক্সায়, কিন্তু বাস স্টেশনে যাওয়ার আগেই তিনি একটি প্রাইভেট কার ডেকে নিলেন। ইউসুফ মৃদু প্রতিবাদ করেছিল, ধমক দিলেন আরমান আলী। বললেন, ‘এই প্রাইভেট কারের ভাড়া তোমার বাবা দেবে, তোমার এত চিন্তা কিসে?’ চুপ হয়ে গেল ইউসুফ। যদিও বাসা থেকে এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা বের হয়নি। সাব্বির সোলায়মান বাস ভাড়া পর্যন্ত দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বাবা নেন নি। বলেছিলেন, ‘এটুকুর ব্যবস্থা আমি করতে পারবো।’

আব্দুস সামাদ সাহেব আরমান আলী স্যারের ছোট বেলার বন্ধু। দুজনের মধ্যে জীবনে একটি দিনের জন্য কোন মনোমালিন্য তৈরি হয়নি। স্থানীয় বাজারে দুইটি দোকান ঘর ছিল তাদের দুজনের। সামাদ সাহেব তাঁর দোকানে রেস্টুরেন্ট স্থাপন করে ব্যবসা করতেন আর আরমান আলী তাঁর অংশে ছাত্র পড়াতেন। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে চা নাস্তা আর দাবা খেলার আড্ডা জমতো আরমান আলী স্যারের চেম্বারে। সামাদ সাহেব একদিন তাঁর ম্যানেজারের বরাত দিয়ে জানালেন বেশ কিছু বকেয়া বিল জমা হয়ে গেছে। গত দুই বছর যাবত তো কোন বিলই দেওয়া হয়নি। আরমান আলী ভেবে দেখলেন, তাঁর পকেটের যে অবস্থা বন্ধুর উক্ত ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে যাবে। তাই তিনি সামাদ সাহেবকে বুঝতে না দিয়েই নিজের দোকান ঘরটি বিক্রি করার প্রস্তাব করলেন। সামাদ সাহেব উচিত মূল্যে দোকানটি কিনে নিলেন। চা-নাস্তার বকেয়া বিলও পরিশোধিত হয়ে গেল। অথচ কত বড় একটি সম্পদ যে খোয়ালেন আরমান আলী নিজেও অনুভব করতে পারেন নি সেদিন। এখন সময়ের পরিবর্তনে সেই দোকান ঘর দু’টিতে সামাদ সাহেব বড় মার্কেট তৈরি করেছেন। নাম রেখেছেন আব্দুস সামাদ শপিং কম্প্লেক্স।


লাল রঙের প্রাইভেট কারটি একেবারে সামাদ সাহেবের বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালো। বাড়ির লোকজন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এই ভরদুপুরে কে এল? সামাদ সাহেব বাড়িতে ছিলেন না, তাঁর চাচাতো ভাই আমজাদ আলী এসে স্বাগত জানালেন আরমান আলীকে। আরমান আলী কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ইউসুফকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন, ‘এই আমার ছোট ছেলে ইউসুফ, তাঁর থাকার ব্যাপারে কথা হয়েছে সামাদ সাহেবের সাথে। এখন কোথায় কিভাবে থাকবে তা আপনারাই ঠিক করে দিন। আমি চললাম।’

‘সে কি, আপনি এই অবেলায় যাচ্ছেন কোথায়? থেকে যান স্যার। দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে যাবেন।’ বললেন আমজাদ আলী।
‘না, আসলে আমার আরেকটা জরুরি কাজ আছে। তা ইউসুফকে কোন্ ঘরে থাকতে হবে একটু দেখে যাই।’
‘হ্যাঁ তাই চলুন, আমাদের বাড়ির পূবের ঘরে থাকবে। নতুন ঘর বানানো হয়েছে।’ বলে হাঁটতে লাগলেন আমজাদ আলী। তাঁর পেছন পেছন আরমান আলী আর ইউসুফও।

গ্রাম অঞ্চলে ‘পূবের ঘর’ নামে একটি আলাদা মেহমান ঘর থাকে অধিকাংশ বাড়িতে। সাধারণত এই মেহমান খানায় লজিং ছাত্ররা থাকে। তো ইউসুফ অনেকটাই এখানে লজিং এর মতোই থাকবে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা করা হয়েছে। সামাদ সাহেবের বাড়িটি বেশ বড়। বাড়িতে একই সারিতে অনেকগুলো ঘর। সেই বাড়ির পূর্ব দিকে বড় পুকুর। পুকুর ঘাটের কাছাকাছি এই টঙ্গি ঘর বা ‘পূবের ঘর’। 
নতুন তৈরি হয়েছে তাই বেশ আকর্ষণীয় দেখতে। এর আগে ঘরটিতে কেউ থাকেনি। ঘরের ভেতর ঢুকে ইউসুফ দেখল অনেক বড় ঘর। কিন্ত ঘরের এক পাশে একটি মাত্র খাটিয়া। এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝতে পারলো ইলেকট্রিসিটির ব্যবস্থা নেই।

‘আপনাদের এখানে ইলেকট্রিসিটি নেই?’ প্রশ্ন করলো ইউসুফ।
‘না, আসলে আমাদের এই গ্রামে এখনও বিদ্যুতের কোন ব্যবস্থা হয়নি।’ ওই একটাই অসুবিধা। বললেন আমজাদ আলী। আরমান আলী একটু অবাকই হলেন। তাঁর এলাকার অনেক গ্রাম এখনও বিদ্যুত বঞ্চিত রয়েছে ভাবতেই পারেননি। তাই ইউসুফের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, ‘কি তোমার বেশি অসুবিধা হলে বলো। অন্যত্র দেখি কোন ব্যবস্থা করা যায় কি না।’
‘না, বাবা। তার আর দরকার নেই। বিদ্যুত নেই তো কি হয়েছে! বাসায় তো বিদ্যুত না থাকলে মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়াশোনা করি।’ ইউসুফ বিদ্যুতহীন অবস্থার পক্ষে যুক্তি দেখালো।
‘তাছাড়া আমাদের বাড়ি থেকেও তো চার জন ছেলে মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে।’ সুযোগ পেয়ে আরেকটা যুক্তি সংযুক্ত করলেন সামাদ সাহেবের চাচাতো ভাই আমজাদ আলী।
‘ব্যস হয়ে গেল, মিটে গেল। তাহলে ইউসুফ, তোমার কোন অসুবিধা হলে আমাকে জানাবে। এখন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতিটা একটু ঝালিয়ে নাও।’ বললেন আরমান আলী।
‘ঠিক আছে বাবা, আপনি কোন চিন্তা করবেন না। আমি সব মানিয়ে নিতে পারবো।’ বলল ইউসুফ আদনান।

দুপুরের তপ্ত রোদে ঘরটির ভিতর বেশ অন্ধকার মনে হচ্ছিল। ইউসুফ দরজা জানালা সব খুলে দিল। তাতে একটু আলো এসে ঘরে প্রবেশ করলো। ‘বাড়ির অন্য পরীক্ষার্থীদের সাথে একবার পরিচিত হওয়া দরকার’ ভাবলো ইউসুফ। কিন্তু আপাতত কোন উপায় নেই। আমজাদ আলী তাকে বসিয়ে সেই কবে বের হয়েছেন, কোন খবর নেই। ইউসুফের খুব অস্বস্তি লাগছিল। এমন অপরিচিত জায়গায় এভাবে আগে কখনো থাকেনি সে। কিছুক্ষণের মধ্যে ছোট্ট একটি মেয়ে এক গ্লাস লেবুর শরবত হাতে নিয়ে প্রবেশ করলো ইউসুফের ঘরে। ‘সালামালাইকুম’ বলে মেয়েটি শরবতের গ্লাসটি ইউসুফের টেবিলে রেখেই দ্রুত বেরিয়ে গেল। ওকে ডাকতে চেয়েছিল ইউসুফ। একটু খোঁজ খবর নেয়া যেত। কিন্তু মেয়েটি খুব দ্রুত চলে গেল। নতুন মেহমানকে খুব লজ্জা পেয়েছে হয়তো বা। ভাবল ইউসুফ। যাক গরমের এই ক্ষণে এক গ্লাস লেবুর শরবত ইউসুফের মনটা বেশ ফুরফুরে করে তুলতে পারল। সে অবাক হলো বাড়ির অন্যান্য লোকজন কেউ তার সাথে দেখা করতে আসছে না দেখে। (চলবে) 



১১.
‘ইউসুফ ভাইয়া, তুমি কখন এসেছো?’ কচি আওয়াজে তন্দ্রাভাব কেটে গেল ।অনেক্ষণ যাবত একা বসেছিল ঘরটাতে। হঠাৎ কেউ তাকে ‘ইউসুফ ভাইয়া’ সম্বোধন করে ডাকছে শুনে অবাক হল । কে তাকে ডাকতে পারে? এখানে পরিচিত কেউ থাকার কথা নয়। দরজার দিকে তাকাল। দেখল শ্যামলা বর্ণের নাদুস নুদুস এক কিশোর তার দিকে তাকিয়ে আছে। 

‘এই তো কিছুক্ষণ আগে এলাম। তুমি কে ভাই?’ বলল ইউসুফ আদনান। 
‘আমি? আমি হচ্ছি সামাদ সাহেবের নাতি।’
‘তাই নাকি, তাহলে তো তুমি আমার ভাতিজা হওয়ার কথা।’ 
‘কেন? কেন? ভাতিজা হতে যাবো কেন?’
‘কারণ সামাদ সাহেব আমার বাবার বন্ধু। তাঁকে আমি চাচা ডাকি।’
‘রাখতো ওসব, বুড়োদের ব্যাপার। তুমি এখন থেকে আমার বাবাকে চাচা বলবে।’

ইউসুফ অবাক হলো ছেলেটির কথায়। ওর সাথে কথা বলে বেশ ভাল লাগছিল তার। জানতে পারল ছেলেটির নাম রাকিবুল আহসান। ডাক নাম রাকিব। পড়ে ক্লাস এইটে। দুপুরের খাওয়া দাওয়া ওই ঘরেই হলো। রাকিব অবশ্য ইউসুফকে ভেতরের ঘরে নিয়ে যেতে চাইছিল। ইউসুফ তেমন কোন আগ্রহ না দেখানো তে এ ঘরেই তার খাবার পরিবেশন করা হলো। বিকালে রাকিবের সাথে বেড়াতে বের হলো ইউসুফ। রাকিবদের বাড়ির পাশেই নদী। নদীর ওপারে ভারত। দেখতে বেশ লাগছিল ইউসুফের। 

পূর্ব নির্ধারিত দিনেই ইউসুফের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। প্রায় মাসব্যাপী চলল পরীক্ষা। ইউসুফ ভাল মতোই পরীক্ষা দিচ্ছিল। এর মধ্যে সামাদ সাহেবের বাড়ির সকলের সাথেই তার ভাল সম্পর্ক হয়ে গেছে। প্রেম, ভালবাসা, ঘর সংসার ইত্যাদি ভাল করে বুঝার মতো বয়স হয়নি তখনও ইউসুফের। তবুও মনের গহীনে মাঝে মধ্যে উঁকি দিত ফারিয়ার মুখ। তাদের গ্রামেরই মেয়ে। গ্রামের বাড়িতে থাকাকালীন যার সাথে প্রায় প্রতিদিনই দেখা হতো, কথা হতো ইউসুফের। ফারিয়া এখন ক্লাস নাইনে পড়ছে। ইউসুফের মনে মাঝে মধ্যেই তার ভবিষ্যত জীবনটা ফুটে উঠতে শুরু করে। শহরে যাওয়ার পর থেকে আজ অবধি ফারিয়ার সাথে দেখা হয় নি তার। কোন যোগাযোগও করার চেষ্টা করেনি। শহরে তাদের পাশের বাসার সেই মেয়েটিকে দেখার পর থেকে মনের ভিতর একটা অচেনা হাওয়াও ভর করেছিল। তাই ফারিয়াকে নিয়ে তেমন একটা ভাবেনি ও। ইদানিং কেন জানি ফারিয়াকে দেখার জন্যে তার মনটা আনচান করতে লাগলো। তাই পরীক্ষার রুটিনে একটানা তিন দিনের বিরতির সুযোগে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলো ইউসুফ। তাদের বাড়ি ফারিয়াদের বাড়ি থেকে একটু সামনে। তাই গ্রামে ঢুকার পর প্রথমেই ফারিয়াদের বাড়ি চোখে পড়ে। প্রধান সড়কের পাশে হওয়ার কারণে ইউসুফ ভাবছিল, প্রথমেই ওদের বাড়িতে চলে যাবে। পরে আবার ভাবলো হঠাৎ করে গিয়ে কি বলবে সে! তাই আনমনে ফারিয়াদের বাড়ির সামনে দিয়েই হেঁটে যেতে লাগলো। একবার ঘাড় বাঁকা করে ওদের বাড়ির দিকে তাকালো। যদি দেখা পায় ফারিয়ার। কিন্তু না, ওকে দেখা গেল। ছুটির দিন তাই আজ তো ফারিয়ার বাড়িতেই থাকার কথা। ভাবল ইউসুফ। ওর বুকের ভিতর ঢিপ ঢিপ করতে লাগলো। তাহলে কি দেখা হবে না ফারিয়ার সাথে? কিভাবে দেখা করবে সে? 

ভাবছিল আর হাঁটছিল ইউসুফ। ফারিয়াদের বাড়ির সীমানা বরাবর পার হতেই পেছন থেকে কেউ একজন ডাক দিল, ‘এ্যাই ইউসুফ......দাঁড়া।’ থমকে দাঁড়াল ইউসুফ আদনান। কণ্ঠটা তার খুবই পরিচিত। ফারিয়ার বড় ভাই শফিকের কণ্ঠ এটা। সব হিসাব নিকাশ ঠিক থাকলে শফিকও এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী হওয়ার কথা। ঘুরে দাঁড়াল ইউসুফ। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল শফিক। 
‘অনেক দিন পরে দেখা, তাই নারে।’ বলল ইউসুফ আদনান।
‘তোর দেখা পাওয়া আমার জন্য সৌভাগ্যের। সেই যে শহরে গেছিস, আর তো তোদের কোন খোঁজ-খবরই নেই।’
‘না মানে, আসলে সময় বের করা যায় না।’
‘বললেই হলো, তুই তো মাঝে মধ্যে চাচীকে নিয়ে আসতে পারতিস।’
‘না রে, পরীক্ষার ঝামেলায় সবদিক আর মনে থাকে না।’
‘সে কি, তুই পরীক্ষা দিচ্ছিস? তাহলে এই পরীক্ষা চলাকালীন হঠাৎ গ্রামের বাড়িতে, কি ব্যাপার?’
‘কোন ব্যাপার না। আসলে আমি তো এখান থেকেই পরীক্ষা দিচ্ছি। পরীক্ষা কেন্দ্র বাড়ি থেকে অনেক দূরে, আর বাড়িতেও কেউ নেই তাই অন্যত্র থাকছি।’
‘বলিস কিরে? তুই শহরে গিয়ে স্কুলে ভর্তি হসনি?’
‘ক্লাস টেনে কি ভর্তি হওয়া যায়? আর তাছাড়া এই তো স্কুল জীবন শেষ করতে যাচ্ছি। তা তোর কি অবস্থা? পরীক্ষা কেমন হচ্ছে? তোকে দেখলাম না একদিনও।’
‘দেখবি কি করে? আমি তো পরীক্ষাই দিচ্ছি না।’ একটা নিঃস্বাস ত্যাগ করে বলল শফিক।
‘পরীক্ষা দিচ্ছিস না, মানে কি? কেন দিচ্ছিস না।’ অবাক হয়ে জানতে চাইল ইউসুফ।
‘আমাদের কি আর সেরকম ভাগ্য আছে? আমি টেস্ট পরীক্ষায় ডাব্বা মেরেছি।’
‘ও মা, তাই বলে পরীক্ষা দিবি না? তোদের স্কুলে তো আগে এত কড়াকড়ি ছিল না।’
‘আগে ছিল না, এখন হয়েছে। আগে তো স্কুল ড্রেস ছাড়াই ছেলে মেয়েরা স্কুলে যেত। এখন সবাইকে বাধ্যতামূলক ড্রেস পরতে হয়। আগে টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করলেও এসএসসি পরীক্ষার জন্য অনুমতি দেওয়া হতো, এখন আর সে দিন নেই রে।’ আক্ষেপ করে বলল শফিক।
‘দুঃখ করিস না বন্ধু। সামনেরবার ভাল করে পড়াশোনা করে পরীক্ষা দেয়।’
‘না রে, সে আমার দ্বারা আর হবে না। আমাকে বিদেশে পাঠানোর কথা ভাবা হচ্ছে। ও হ্যাঁ, তোকে তো বলাই হয়নি। আগামী শুক্রবার ফারিয়ার বিয়ে। আমি তোদের বাসায় গিয়ে বলে আসব ভাবছিলাম।’
ইউসুফের বুকের ভেতর ধক্ ধক্ করে কাঁপছিল। তার কান দিয়ে আর কোন কথাই ঢুকছিল না। কেবল একটি কথাই শুনছিল সে, ‘আগামী শুক্রবার ফারিয়ার বিয়ে, আগামী শুক্রবার ফরিয়ার বিয়ে।’
‘কি ভাবছিস ইউসুফ? চল্ বাড়িতে চল্।’ ইউসুফকে আনমনে ভাবতে দেখে ওর হাত ধরে নিজের বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেল শফিক। ইউসুফ কিছু না বলেই হাঁটতে লাগলো। (চলবে)