শনিবার, ২৮ মে, ২০১১

বাংলা ব্লগ: স্বপ্নের এক নতুন পৃথিবী

'ব্লগ' শব্দটার সাথে এখন কমবেশি সকলেই পরিচিত। বিশেষ করে কম্পিউটার-ইন্টারনেটের জগতে যাদের বিচরণ। যারা লেখালেখির সাথে জড়িত ব্লগ তাদের জন্য নিয়ে এসেছে এক অসাধারণ সুযোগ। এই সুযোগে কলম আর কাগজের ব্যবহার কিছুটা হলেও কমে গেছে। লেখালেখি ছাড়াও ব্লগে অনেকেই আড্ডা দিতে আসেন, পড়তে আসেন, জানাতে আসেন নিজের অনুভূতি । ব্লগের এক একটি ঠিকানা ব্লগারদের নিজের বাড়ির মতোই। তাই নতুন অথিতিকে তারা সাদর সম্ভাষণ জানান এভাবে- 'আমার ব্লগ বাড়িতে আপনাকে স্বাগতম!' অথবা কাউকে আমন্ত্রণ জানান এভাবে- 'একবার সময় করে আমার ব্লগ বাড়িতে বেড়াতে আসবেন।' তাহলে ভেবে দেখুন ব্লগ আমাদের জীবনে কিভাবে জড়িয়ে পড়েছে।

ব্লগ জিনিসটা কি?
'ব্লগ' শব্দটি মূলতঃ 'ওয়েবলগ' শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ। এটা এক ধরনের ওয়েবসাইট যেখানে লেখক-পাঠকের মধ্যে মতবিনিময় করা সম্ভব। অনেকেই ব্লগকে ওয়েব জার্নাল বা ডায়েরী বলে থাকেন। কেউ কেউ নিজের ওয়েব সাইট তৈরির পরিবর্তে ব্লগ তৈরি করে থাকেন কারণ এটা সহজেই আপডেট করা যায়। ব্লগে আপনি লেখার পাশাপাশি ভিডিও এবং ছবিও আপলোড করতে পারবেন খুব সহজে। ডায়েরী লেখার মতোই নিজের একান্ত ভাবনাগুলো লিখে রাখতে পারবেন। শেয়ার করতে পারবেন অন্যদের সাথে। অন্য কারো লেখা পড়তে পারবেন। জানাতে পারবেন ভাল-লাগা মন্দ লাগা। গড়ে তুলতে পারবেন কথোপকথন কিংবা বিতর্ক । সাধারণ জগতে যেখানে আপনার একটি লেখা পড়ার পর ইচ্ছে করে লেখককে ধন্যবাদ দিতে কিন্তু আপনি কোন যোগাযোগের মাধ্যম না থাকায় ধন্যবাদ জানাতে পারেন না সেখানে ব্লগে আপনি পড়া মাত্রই মন্তব্য করতে পারবেন। লেখকও আপনাকে মন্তব্যের জবাব দিবেন। ভাবতেই অবাক লাগে তাই না? আপনি যদি একজন লেখক হয়ে থাকেন তাহলে আপনার লেখাটি পোস্ট করার সাথে সাথেই শত শত পাঠকের সামনে চলে যাবে। অথচ পত্রিকার পাতায় সেটা ছাপানোর জন্য আপনাকে কত ঝামেলাই না পোহাতে হয়! আর সেটা ছাপা হলেও কত জন পাঠক আপনার লেখাটি পড়েছে তা আপনার জানা হয় না। কিন্তু ব্লগে আপনি সেই পরিসংখ্যানও পাবেন। আপনি নতুন লেখক হলে অভিজ্ঞ লেখকদের পরামর্শও পেতে পারেন। যদি আপনি কোন কমিউনিটি ব্লগে লেখালেখি করেন তাহলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে আপনার একটি নিজস্ব অবস্থান তৈরি করতে পারবেন। কিছুদিন লেখালেখি বন্ধ কিংবা ব্লগে আপনার উপস্থিতি কমে গেলে দেখবেন কিভাবে সবাই আপনাকে মিস করবে! অথচ অধিকাংশই সেখানে পরস্পর পরস্পরের সাথে অপরিচিত! অনেকেই ব্লগ লিখতে গিয়ে ছদ্ম নাম ব্যবহার করেন। আপনি কোন ছদ্মনাম ব্যবহার করলে ব্লগবাসী আপনাকে সেই নামেই চিনবে। সবমিলিয়ে এটা সম্পূর্ণরূপে অন্য এক জগত! বেতার-টিভি কিংবা সংবাদপত্রে দর্শক-শ্রোতারা তাদের কোন প্রতিক্রিয়া বা প্রতবিাদ জানাতে সরাসরি ওই মাধ্যমটিকে ব্যবহার করতে পারে না। তাদের চিঠি লিখতে হয় কিংবা স্ব-শরীরে হাজিরা দিয়ে বলতে হয়। অথচ ব্লগে তা সরাসরি প্রকাশ করা যায়।

জানা যায় ১৯৯৪-৯৫ সালের দিকে 'ওয়েবলগ' বা ব্লগের সূচনা হয় সর্ব প্রথম। এ সময় ব্লগকে 'অনলাইন ডায়েরী' হিসেবে অভিহিত করা হতো। ধীরে ধীরে এর পরিধি বাড়তে থাকে। ব্লগ একটি স্বতন্ত্র ওয়েবসাইট হতে পারে আবার অন্য ব্লগ প্রোভাইডার বা ব্লগ সেবাদানকারী ওয়েবসাইটের একটি স্বাধীন পেজ বা অংশও হতে পারে।

বাংলা ব্লগের কার্যক্রম
বাংলা ভাষায় ব্লগিং শুরু হয় সামহোয়্যার ইন ব্লগ দিয়ে। বাংলা ভাষা-ভাষী অনলাইন ব্যবহারকারীদের কাছে ব্লগ আলাদা গুরুত্ব পায়। দেশে অবস্থানকারী ব্লগারদের পাশাপাশি প্রবাসী বাঙালিরা ব্লগে সময় কাটান। লিখেন, পড়েন এবং মন্তব্য করেন তারাও। বিদেশে বাঙালিদের চারপাশে যখন অপরিচিত ভাষার সমাহার তখন বাংলা ব্লগে তারা খুঁজে পান নিজের একান্ত আপন ঠিকানা। ব্লগে ঢোকার সাথে সাথে তাদের মনে হয় যেন বাংলাদেশেই পা রাখলেন এই মাত্র। নানা কর্মব্যস্ততার মধ্যেও তারা তাই ব্লগে সময় দিয়ে থাকেন। বর্তমানে বাংলা ভাষায় যে সমস্ত কমিউনিটি ব্লগ চালু আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো (জনপ্রিয়তার বিচারে নয়, বর্ণমালা অনুসারে সাজালাম) : আইটেক বাংলা, আমার বন্ধু, আমার ঠিকানা, আমাদের কথা, আমাদের প্রযুক্তি, আমার ব্লগ, আমার বর্ণমালা, আড্ডা ব্লগ, ওপেস্ট, একুশে ব্লগ, এসিএম সলভার, কফি হাউজের আড্ডা, ক্যাডেট কলেজ ব্লগ, গণিত পাঠাশালা.কম, চতুর্মাত্রিক, জীবনযাত্রা, টেকটিউনস, টেকনোলজি টুডে ব্লগ, ত্রিভুজ নেটওয়ার্ক, নাগরিক ব্লগ, নৃ.ওরগ, নীলঞ্চল বাংলা ব্লগ, পিস ইন ইসলাম, প্রজন্ম ফোরাম, প্রথম আলো ব্লগ, বকলম, বাঁধ ভাঙ্গার আওয়াজ, বাংলা দুনিয়া, বিজ্ঞান প্রযুক্তি, বিজ্ঞানী, বিবর্তন বাংলা, বিডিটিউটোরিয়াল ২৪, বিডিনিউজ২৪বাংলা ব্লগ, বিসর্গ, বলতে চাই স্বপ্নের কথা, মুক্তব্লগ, মুক্তমনা বাংলা ব্লগ, মুক্তাঙ্গন: নির্মাণ ব্লগ, রংমহল, লোটাকম্বল, শব্দনীড়, সচলায়তন.কম, সবুজের কলতান ব্লগ, সদালাপ, সাহিত্য.কম, সোনার বাংলাদেশ ব্লগ প্রভৃতি।

কিভাবে ব্লগ লিখবেন?
ব্লগে লিখতে হলে আপনার তেমন কিছুই করতে হবে না। শুধু দরকার একটি কম্পিউটার ও ইন্টারনেট কানেকশন। অনলাইনে বাংলা লেখার জন্য দরকার হবে ইউনিকোড সফ্টোয়্যারের। তারপর আপনি যে ব্লগে লিখতে চান সেই ব্লগ সাইটটিতে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। আপনি উক্ত ব্লগের একজন সদস্য হওয়ার পর থেকেই লেখালেখি আরম্ভ করতে পারবেন। ব্লগে রেজিস্ট্রেশন করার জন্য আপনার একটি সক্রিয় ইমেইল এড্রেস থাকতে হবে। আপনি যে ব্লগে লিখতে চান উক্ত ব্লগ সাইটের হোম পেজে 'রেজিস্ট্রেশন' বা 'নিবন্ধন' বাটনে ক্লিক করলেই একটি ফর্ম আসবে। উক্ত ফর্মটি যথাযথভাবে পূরণ করার পর ব্লগ কর্তৃপক্ষ আপনার ইমেইলে একটি 'এক্টিভ্যাশন লিংক' পাঠাবে। উক্ত লিংকে ক্লিক করেই আপনি আপনার ব্লগীয় জীবন শুরু করতে পারবেন। 'ব্লগার' হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর আপনি ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মতামত, সাহিত্য, চিত্রকলা সবকিছুই প্রকাশ করতে পারবেন। ব্লগিং করার জন্য আপনাকে দেওয়া হবে আনলিমিটেড স্পেইস। আপনি আপনার সব ধরনের কার্যক্রমই ব্লগারদের সাথে শেয়ার করতে পারবেন। তবে প্রায় সকল ব্লগেই তাদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নীতিমালা তৈরি করেছে। আপনি সেই নীতিমালা লঙ্ঘন করলে আপনাকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে ব্যান করা হতে পারে কিংবা কেবল আপনার পোস্টটি মুছে দেওয়া হতে পারে। প্রায় সকল ব্লগেই 'সঞ্চালক' বা মডারেটর রয়েছেন এসব দেখাশোনার জন্য।

ব্লগ এবং অন্যান্য স্যোসাল নেটওয়ার্কিং সাইট:
ফেইস বুক, টুইটার, মাইস্পেস, অর্কুট, সাইট টক প্রভৃতি সামাজিক যোগাযোগের ওয়েব সাইটের মতো ব্লগসাইট গুলোরও রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। ব্লগাররা প্রতিনিয়ত কথোপকথন করছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। সমাজ ও রাস্ট্রের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরছেন তাদের লেখনীর মাধ্যমে। ফেসবুক বা টুইটারের মতো তাই বাংলা ব্লগও হয়ে উঠেছে তারুণ্যের প্রিয় ঠিকানা। বার্তা আদান প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে ব্লগে, চ্যাট করার সুবিধাও হয়তো চলে আসবে অচিরেই।

শেষ কথা:
মূলধারার প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার চাইতে ব্লগ পরিচালনায় খরচ অনেক কম। তাই নতুন নতুন ব্লগ সাইট জন্ম নিচ্ছে প্রতিদিন। লেখক সাহিত্যিকেরাও ধীরে ধীরে এই মাধ্যমে নিয়মিত হয়ে যাচ্ছেন সকলেই। তাই বাংলা ব্লগের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে দিন দিন। তাহলে আর দেরি কেন? যদি আপনি এখনও এই জগতের বাসিন্দা না হয়ে থাকেন, এখনই শুরু করে দিন আপনার ব্লগীয় জীবন। গড়ে তুলুন আপনার স্বপ্নের নতুন পৃথিবী।

শুক্রবার, ২৭ মে, ২০১১

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গ: নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি

'মুক্তিযুদ্ধ' বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক শব্দ এবং এ শব্দের মূল বিষয় বস্তুটি দেশবাসীসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও মীমাংসিত। অথচ মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের প্রায় চার দশক পরেও দেশে 'যুদ্ধাপরাধী' প্রসঙ্গটি এখন পর্যন্ত একটি বিতর্কিত এবং অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে নতুন প্রজন্মসহ সমগ্র জাতির মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। 'মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি' এবং 'মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি' বলেও আরো দু'টি ধারা তৈরি করে দেশ ও জাতিকে বিভক্ত করার জোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে কোন কোন মহলের পক্ষ থেকে। দেশবাসী যখন বিভিন্ন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ কিংবা বুদ্ধিজীবীদের নিকট থেকে সঠিক দিক নির্দেশনা আশা করে তখন উল্টো সেইসব শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিবর্গের সত্য-মিথ্যায় মিশ্রিত তথাকথিত বুলিতে বিভ্রান্ত হয়ে হতাশার নদীতে ঝাঁপ দিতে বাধ্য হয়। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে এ দেশের বর্তমান প্রজন্ম (যাদের জন্ম ৭১ সালের পরে) কী করে স্বাধীনতার পক্ষ অথবা বিপক্ষ শক্তি হয় তা বোধগম্য হওয়ার কথা নয় কোন সুস্থ মস্তিস্কের সচেতন মানুষের। যে ব্যক্তির জন্মই হয়নি একাত্তর সালে, সে আবার কীভাবে যুদ্ধাপরাধী বা রাজাকার হয়? কিংবা যুদ্ধকালীন সময়ে যার বয়স ৫/৬ বছরের বেশি ছিলনা, সে কী করে যুদ্ধাপরাধী হতে পারে? 'মুক্তিযুদ্ধ' এবং 'যুদ্ধাপরাধী' প্রসঙ্গে সম্পূর্ণ রাজনীতি নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে একটু গভীরভাবে বিষয়টিকে পাঠকদের সামনে উপস্থাপনই মূলতঃ এ নিবন্ধের মূখ্য উদ্দেশ্য।

কেন হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ?
১৯৪৭ সালে যে মহান লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে 'পাকিস্তান' নামক রাষ্ট্রটি স্বাধীনতা লাভ করেছিল তার সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি দীর্ঘ ২৪ বছরেও। বিশেষ করে 'পূর্ব পাকিস্তান' অংশটি 'পশ্চিম পাকিস্তানী' শাসকদের দ্বারা শোষিত হয়ে আসছিল শুরু থেকেই। সেই শোষণ আর বঞ্চনার ফলেই পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল বিশেষভাবে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ৬৯ সালের গণ অভ্যুথানের পথ ধরে ৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ মূলতঃ বাঙালিদের ক্রমাগত ক্ষোভের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ছিল। সেদিন সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বলেই মাত্র নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিজয় অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। ১৯৭১ সালে 'বাংলাদেশ' নামক রাষ্ট্রটিকে যেমন একটি 'ইসলামী রাষ্ট্র' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কোন উদ্দেশ্য ছিল না, ঠিক তেমনিভাবে এ রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষকতা ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠারও কোন চেতনা ছিল না। এমনকি আওয়ামীলীগের যে ৬ দফা এবং ছাত্রদের যে ১১ দফা দাবীকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল সেসবের মধ্যেও ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র কিংবা ইসলাম এসব কোন মতাদর্শেরই উল্লেখ ছিল না। নতুন প্রজন্মের কাছে আজকে এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদ 'ধর্মনিরপেক্ষতা' এবং 'সমাজতন্ত্র'-কে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে পরিচিত করাচ্ছেন, অথচ, এ দু'টির কোনটাই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অংশ নয়। প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানিদের রাজনৈতিক নিপীড়ন, সাংস্কৃতকি আধিপত্য ও অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তির যুদ্ধ।

আমরা কী মুক্ত হতে পেরেছি?
যে চেতনা বুকে ধারণ করে আমরা ৭১ সালের মুক্তিযু্দ্ধে বিজয়ী হয়েছিলাম, তার সফল বাস্তবায়ন হয়নি বিজয় লাভের দীর্ঘ ৩৭ বছরেও। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল একটি স্বাধীন সার্রভৌম রাষ্ট্র যেখানে আমরা হয়েছি একটি লাল-সবুজের পতাকার মালিক মাত্র। অর্থনৈতিক শোষণ আর রাজনৈতিক নিপীড়ন হতে মুক্ত হতে পারেনি এ দেশের জনগণ। মুক্তি পায়নি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকেও। এ দেশের রাজনীতিবিদরার 'মুক্তিযুদ্ধ'-কে পুঁজি করে নিজেদের পকেট ভরতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই। যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন প্রেরণার উৎস, যাকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ, যিনি ঘোষণা করেছিলেন, 'এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম- স্বাধীনতার সংগ্রাম' সেই কালজয়ী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বাঁচতে পারেননি এ দেশের নোংরা রাজনীতির কবল থেকে। ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের সমন্বিত এক অদ্ভূত রাষ্ট্রনীতি দিয়ে দেশ চালাতে গিয়ে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিলেন বাঙালি জাতির এ মহান নায়ক। চুয়াত্তর সালের অনাকাঙ্খিত দুর্ভিক্ষ জাতিকে এক কঠিন বিপদের মুখোমুখি এনে দাঁড় করালো। মুক্তিযুদ্ধের আসল চেতনা, মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধে শহীদদের কথা চিন্তা না করে নিজেদের আখের গোছাত্ই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল এ দেশের স্বার্থপর শাসক গোষ্ঠি। ফলে জনগণ শোষিত হলো সেই আগের মতো্ই। একদলীয় 'বাকশাল' কায়েমের মধ্য দিয়ে তার ষোলকলা পূর্ণ করেছিলেন 'বাংলাদেশ' নামক রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অবশেষে নিহত হলেন তিনি সপরিবারে নির্মমভাবে তাঁরই ঘনিষ্ঠ কিছু ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে। ক্ষমতার মসনদে এলেন বঙ্গবন্ধুর বাকশাল মন্ত্রী সভারই একজন সদস্য 'খোন্দকার মোস্তাক আহমদ'। চলল অবাধে শোষণ প্রক্রিয়া। জাতির ঐ ক্রান্তিকালে ইতিহাসের ধারায় আবির্ভূত হলেন স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে পরিচিত 'জেনারলে জিয়াউর রহমান'। ৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর ঐতিহাসিক সিপাহী বিপ্লবের মাধ্যমে জাতি দ্বিতীয়বারের মতো স্বপ্ন দেখতে পেল স্বাধীনতার। ক্ষমতায় বসলেন জিয়াউর রহমান, কিন্তু ঠিকতে পারলেন না বেশি দিন। বিদ্রোহী সেনাদের হাতে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে তাঁকেও চলে যতে হল। শুরু হল স্বাধীন বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের যুগ। সমালেচালকরা যাই বলেন না কেন, সামরিক শাসক এরশাদও চেষ্টা করলেন টেনেটুনে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার। প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলেন এ দেশের গণতন্ত্রকামী জনসাধারণ।

গণতন্ত্রের মানে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। ৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল। কিন্তু দেশবাসী কী পেল এই গণতন্ত্রে বাস্তবায়নে? ৯৬ সালে সরকার বদল হল, তাতে জনগণের কী প্রাপ্তি ঘটল? শুধু হরতাল, ধর্মঘট, অবরোধ, ভাঙচুর আর রাজপথে মানুষ হত্যার উৎসবই কী তাহলে গণতন্ত্র? দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঘোড়া মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার নামই কী তাহলে স্বাধীনতা?  



'যুদ্ধাপরাধী' আসলে কারা?
------------------
১/১১ এর পর দেশের চরম রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংকটেও এই 'যুদ্ধাপরাধী' ইস্যু নিয়ে এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদ, মিডিয়া এবং বুদ্ধিজীবীদের বেশ আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। দেশের অসংখ্য অগণিত সমস্যার কথা চিন্তা না করে এ সমস্ত গুণি ব্যক্তিবর্গ এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বারবার একটি দাবী উত্থাপন করতে থাকেন, 'যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই', 'যুদ্ধাপরাধীদের নিবন্ধন দেওয়া যাবে না' ইত্যাদি। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দেশের প্রধান ও প্রাচীন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ও তাদের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন এবং তাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নির্বাচনী মহাজোটের পক্ষ থেকে এসব কথা বেশি উচ্চারিত হতে থাকে। পরবর্তীতে এটাকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও যোগ করে। মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এ বিষয়টিকে সামনে রেখে 'বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী' নামক সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করা এবং এ সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে 'যুদ্ধাপরাধী' সাব্যস্থ করে তাদের বিচারের ব্যাপারে বিভিন্ন পর্যায়ে বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়া শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার একটি মামলায় জামায়াতের শীর্ষ তিন নেতাকে এবং পরবর্তীতে আরো ২জন শীর্ষ নেতা সহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়। প্রথমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার কথা বললেও পরবর্তীতের জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে আরো অনেক মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনও করা হয় অকল্পনীয়ভাবে। এরই মাঝে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে শুরু হয় প্রহসন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যুদ্ধাপরাধী নির্মূলের নামে আসলে জামায়াতে ইসলামীকেই নির্মূলের টার্গেট করা হয়েছে। এখন কথা হলো জামায়াত কিংবা তাদের নেতৃবৃন্দ কী আসলেই যুদ্ধাপরাধী? যদি তাই হয়, তাহলে কী কেবল তারাই যুদ্ধের সময় অপরাধ করেছেন, অন্য কেউ নয়? আসুন আমরা জেনে নেই যুদ্ধাপরাধী আসলে কারা?

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা অপরাধ করেছিল তারাই প্রকৃতপক্ষে 'যুদ্ধাপরাধী'। সে হিসাবে দেখা যাচ্ছে ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন সময়ের মূল অপরাধী হচ্ছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। জানা যায় পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে যারা যুদ্ধাপরাধী ছিল তাদের বিচারের জন্যই International Crimes (Tribunal) Act করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে মূল যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত ১৯৫ জন পাকিস্তানি নাগরিকের বিচারের জন্য এ আইন তৈরি করা হয়েছিল। বিজ্ঞ জনেরা বলছেন আওয়ামীলীগই অতীতে সব যুদ্ধাপরাধীকে ছেড়ে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের বিচারকার্য শেষ করেন। যারা চিহ্নিত অপরাধী ছিল তাদেরকে তখন শাস্তিও দেওয়া হয়েছিল। এখন একই অপরাধের বিচার কয়বার করা হবে? আর বিচার যদি করতেই হয় তাহলে আগে ক্ষমা করে দেয়া সেই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে পাকিস্তান থেকে ফিরিয়ে এনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। এরপর তাদের সহযোগীদের বিচারের প্রসঙ্গ আসতে পারে। আর সেক্ষেত্রে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যারা প্রতক্ষ্য ও পরোক্ষভাবে পাক সেনাদের সহযোগিতা করেছিল তাদের তালিকা তৈরি করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে ৭১ সালে যে সমস্ত দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিল তাদের মধ্যে রয়েছে 'মুসলিম লীগ', 'নেজামে ইসলাম পাটি' 'জামায়াতে ইসলামী' প্রভৃতি। এসব দলের মদ্যে বর্তমানে কেবল জামায়াতে ইসলামী ভাল অবস্থানে থাকার ফলে সরকারকে তাদের দিকেই নজর দিতে হবে, এটা যৌক্তিক হতে পারে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে এ দেশের অন্য প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোতেও 'যুদ্ধাপরাধী' বা রাজাকারদের অবস্থান থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন কথা কখনোই উঠছেনা। একতরফা ভাবে জামায়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের পাশাপাশি এসব মহলের কাছ থেকে ধর্মীয় রাজনীতি বা ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধেরও দাবী উঠছে বারবার। এখন কথা হচ্ছে মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ জামায়াতের বিভিন্ন নেতা যদি আওয়ামীলীগ বা বিএনপি করতেন তাহলে কী এমন অভিযোগ উত্থাপিত হতো তাদের বিরুদ্ধে? শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কাউকে 'যুদ্ধাপরাধী' হিসবে চিহ্নিত করাটা যৌক্তিক হতে পারেনা।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে 'যুদ্ধাপরাধী' প্রসঙ্গটা কী একেবারেই অযৌক্তিক? নিশ্চয়ই না? কিন্তু মুক্তিযু্দ্ধের ৩৯ বছর পরে হঠাৎ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যমক্রম নিয়ে সাধারণ মানুষের সন্দেহ বা সংশয় থাকতেই পারে। 'যুদ্ধাপরাধী' শব্দটিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যুদ্ধের সময়ে যারা সুনির্দিষ্ট অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তারাই হচ্ছে 'যুদ্ধাপরাধী'। যেমন- যুদ্ধের সময় সরাসরি যুদ্ধে জড়িত নয় এমন নারী, শিশু, ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে হত্যা করা, বেসামরিক বাড়িঘর, স্থাপনা, দোকানপাট, শস্য ভাণ্ডার বা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি লুটপাট বা অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ প্রভৃতি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ জাতীয় অনেক অপরাধই সংঘটিত হয়েছে। যারা এসব অপরাধা করেছে তারাই মূলত যুদ্ধাপরাধী। রাজনৈতিক কারণে জামায়াতসহ বিভিন্ন দল মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিলেও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা স্বাধীনতাকে মেনে নিয়েছে। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের মতো অপরাধে জড়িতদের বাদে শুধু রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি বা বিরোধীতা করেছিল তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। ঐসময় প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের যথাসম্ভব চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে জামায়াতেরও অনেকেই ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত 'যুদ্ধাপরাধী' হিসেবে চিহ্নিত হয়নি কিংবা জামায়াতের বর্তমান নেতৃবৃন্দের মধ্যে কেউই সে সময় 'যুদ্ধাপরাধী' হিসেবে চিহ্নিত হয়ে সাজাভোগ করেন নি। 



কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
----------------------------
চলমান বিচার প্রক্রিয় নিয়ে শংকিত আইন বিশেষজ্ঞরা
................................................................
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেছেন, স্বাধীনতার পরও মানবতাবিরোধী অনেক অপরাধ হয়েছে। যা এই International Crimes (Tribunal) Act- এ আসতে পারে। যেহেতু যুদ্ধাপরাধ নয় বরং ৭১ সালে যুদ্ধকালীন সময়ে সংঘটিত মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, সুতরাং স্বাধীনতা পরবর্তী রক্ষীবাহিনীর নির্যাতনকেও মানবতাবিরোধী আইনের অন্তভূক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, ন্যায় বিচার না হলে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ১০ অপরাধীকে খালাস দেয়ার চেয়ে একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে সাজা দেওয়ার পরিণাম হবে ভয়াবহ। বর্তমানে যে আইনে বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তাতে কোন অবস্থাতেই সুবিচার করার সুযোগ নেই। আর এমন কোন বিচার করবেন না, যাতে আপনাদের আবার বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়।

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি, প্রফেসর ড. এমাজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ জঘন্য অপরাধেল সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তান আর্মি সদস্যদের কোন কথাই এখন উচ্চারিত হচ্ছে না। বিচার যদি করতেই হয় তাহলে আগে ক্ষমা করে দেয়া সেই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে পাকিস্তান থেকে ফিরিয়ে এনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। এর পর সহযোগীদের বিচারের প্রশ্ন আসবে। কিন্তু সরকার বিচারের উদ্দেশ্যে কিছুই করছে না। সরকারের কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে তারা বিরোধী পক্ষকে ঘায়েল করার জন্যই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে। এটা কোন অবস্থায়ই গ্রহণযোগ্য হবে না।

সাবেক স্পিকার ব্যারিষ্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেছেন, কথিত International Crimes (Tribunal) Act অনুযায়ী বিচারক নিজেই তার সুবিধামতো আইন প্রণয়ন করতে পারবেন। এরূপ বিধান দুনিয়ার কোন সভ্য সমাজের আইন হতে পারে না। এটা কোর্ট মার্শালের চেয়েও ভয়াবহ। একতরফা বিচারের শামিল। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলেই তাকে গ্রেফতার করা হবে, আর তাকে জামিন দেয়া হবে না এমন বিধান রয়েছে এ আইনে। এতে ন্যায় বিচার আশা করা যায় না।



সাবেক আইন মন্ত্রী ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, ১৯৭৩ সালের আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী বন্দির বিচার সম্পন্ন করা। সহযোগী দালালদের জন্য নয়। ১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই সংবিধানের প্রথম সংশোধনী আইন পাস হয়। এ সংশোধনী অভিযুক্ত ব্যক্তির ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন Judicial Review- এর অধিকারও খর্ব করেছে। এ আইনটিতে যে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া হয়েছে তাও আপত্তিকর। এ আইনে নির্দোষিতার অনুমান (Presumption of innocence) ও জামিনের বিধান না থাকায় তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়।

ব্যারিষ্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ১৯৭৩ সালের আইনটি একটি ত্রৃটিযুক্ত আইন। এ আইনের প্রয়োগ অসাংবিধানিক। এর আলোকে বিচার হলে তা হবে অবৈধ। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে এ আইনের তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। এ আইনে অভিযুক্তের অধিকার রক্ষিত হয়নি।

ব্যরিষ্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, এ বিচার আরেক ধরনের মানবতাবিরোধী কাজ হবে। মইন-ফখরুদ্দীনের সময়ে যে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হয়েছে তা বাদ রেখে হঠাৎ করে ৩৯ বছর আগের এ বিষয় নিয়ে সরকারের বাড়াবাড়ি সন্দেহের উদ্রেক করেছে।

ব্যারিষ্টার ফাতেমা আনোয়ার বলেছেন, ১৯৭৩ সালের আইনটির আন্তর্জাতিক আইনের বিষয়ের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালকে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারের অনেকটাই এখানে অভিযুক্তের পক্ষে সংরক্ষণ করা হয়নি। প্রচলিত সাক্ষ্য আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি অপ্রয়োজনে যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

ব্যারিষ্টার বেলায়েত হোসেন বলেছেন, আইনটিতে কোন গাইডলাইন ছাড়াই বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনাল তার নিজস্ব বিধি প্রণয়ন করবে। এতে সর্বোচ্ছ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড থেকে যে কোন শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। অথচ কোন গাইডলাইন নেই। একদিকে দীর্ঘদিন আগের অপরাধ, অন্যদিকে আইনের দুর্বলতা কীভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে তা সচেতন মহলের বুঝে আসছেন।

প্রথমদিকে এই 'যুদ্ধাপরাধী' সংক্রান্ত বিষয়টি আওয়ামিলীগ ঢাকঢোল পিটিয়ে বললেও তাঁদের আইন মন্ত্রী ব্যারিষ্টার শফিক আহমদ যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষ করে এসে বলেছিলেন, 'যুদ্ধাপরাধী' বলা যাবেনা, বলতে হবে 'মানবতা বিরোধী অপরাধ'। তারপরও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, এমপি ও সরকারি দলের নেতার দেদারসে 'যুদ্ধাপরাধের বিচার' বলে মাঠ কাঁপাচ্ছেন!

বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০১১

রহস্য উপন্যাস- 'নয়া জীবনের হাতছানি'

undefined
পূর্ব কথা
[এই উপন্যাসের কাহিনী সম্পূর্ণ কাল্পনিক। জীবিত কিংবা মৃত কারো সাথে কাকতালীয়ভাবে কাহিনীর কোন মিল পাওয়া গেলে সেটাকে কাকতালীয় ঘটনাই মনে করতে হবে। ব্লগে প্রকাশের পূর্বে এই পর্বটি দৈনিক প্রভাত বেলার শিশু-কিশোর পাতা অঙ্কুরে এবং শিশু-কিশোর পত্রিকা মাসিক কচি-তে ছাপা হয়েছে। ]


বাঁধন সবেমাত্র স্কুল থেকে ফিরেছে। এমন সময় দেখতে পেল রাস্তায় মানুষের ভীড়। কৌতুহলী মনে সে দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠলো। পাশের বাড়ির মারজানকে পেটানো হচেছ। পেটাচ্ছেন মারজানেরই বাবা। লোকজন এসেছে মারজানকে বাঁচাতে, কিন্তু কেউই মারজানের বাবা আরমান আলীর হাত থেকে লাঠিটা সরাতে পারছে না। আরমান আলী তার ছেলের উপর অমানবিক নির্যাতন চালাচ্ছেন, আর বাড়ির সকলে সে দৃশ্য দেখছেন নাটক-সিনেমার মতোই। বিষয়টি সত্যি বেদনাদায়ক! 

বাঁধন সবেমাত্র ক্লাস এইটে পড়ে আর মারজান তারই ক্লাসমেট। তবে মারজান সবক্ষেত্রেই বাঁধনের বিপরীত প্রকৃতির ছেলে। লেখাপড়া করেনা বললেই চলে। সারাদিন ক্লাস ফাঁকি দিয়ে খারাপ ছেলেদের সাথে আড্ডা দেয়। এই বয়সে সিগারেট পর্যন্ত টানার অভ্যাস করে ফেলেছে। মারজানকে তার বাবা-মা এমনকি চাচারাও প্রায়ই বেত্রাঘাত করেন। কিন্তু কোন ফল পাওয়া যায়না। মার খাওয়ার সময় কান্নার আওয়াজে সারা গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে যান। সে তখন সুর করে বলে, 'আমি আর এসব করবনা। আমি তোমাদের কথামতো চলব।' কিন্তু পরদিন থেকে ঠিকই সে তার কর্ম চালিয়ে যায় আগের মতোই।

বাঁধন একটি বিষয় লক্ষ্য করল, অন্যদিন মারজানকে পেটানোর সময় তার দাদী এসে তাকে বাঁচাতো, কিন্তু আজ তাঁকেও দেখা যাচ্ছে না। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া বাঁধনের এখন আর কিছুই করার নেই। প্রায় আধঘন্টা পেটানোর পর মারজান অজ্ঞান হয়ে গেল। মারজানের বাবা এতটা আশা করেননি। নিজের ভুল বুঝতে পেরে দ্রুত ছেলেকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। মফস্বলে বাড়ি মারজানদের। ঝিনাইদহ জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় হাকিমপুর (কল্পিত নাম) গ্রামে জন্ম তার। হাকিমপুরের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করার কিছুক্ষণ পর ডাক্তাররা ওকে জেলা সদরে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। হাসপাতালে মারজানের মা, দাদীসহ সবাই উপস্থিত ছিলেন। সদর হাসপাতালে পাঠানোর ব্যাপারে সবাই একমত হলেন। মারজানকে নিয়ে তার পিতা আরমান আলী ঝিনাইধহ সদর হাসপাতালে চলে গেলেন। দু'দিন চিকিৎসার পর মারজানকে সুস্থ দেখা গেল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মারজানের ছাড়পত্র তৈরি করতে লাগল। ঠিক হলো রাত শেষ হলেই ভোরে মারজানকে নিয়ে আরমান আলী বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন।

 হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মারজান ভাবছিল তার করুণ জীবনের কথা। নিজের কারণেই তার এত দুর্ভোগ। কিন্তু দুষ্টুমি করা কী সে আদৌ ছাড়তে পারবে? পূর্বে বাবা মেরেছেন কিন্তু এবারের মতো নয়। মারজানের মাথায় হঠাৎ একটা চিন্তা এসে গেল। কী লাভ বন্দী জীবনে থেকে। আবার তো বাবা তাকে এমনভাবে পেটাবেন। কারণ সে তো অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটাতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ঠিক রাত ১২টার সময় মারজান সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। পালাতে হবে, যে করেই হোক তার স্বাধীন থাকা চাই। স্কুলের পড়া আর ভাল লাগে না। ভাল লাগে না বাবা-মা আর টিচারদের বকুনি। গরু পেটানোর মতো বেত্রাঘাত স্কুলে এবং বাড়িতে আর সে খেতে চায়না। এবার তো বাবা তাকে প্রায় মেরেই ফেলেছিলেন। না হয় অন্যায় কাজ করেছি, তাই বলে মেরে ফেলবে? মোহাম্মদ স্যারের মেয়েকে চোখ মেরেছি বলে শেষ পর্যন্ত বাবা আমাকে মেরে ফেলতে চাইল। ভাবনার সাগরে হাবুডুবু খেতে লাগল মারজান। আরমান আলী শুয়েছিলেন তার পাশের বেডে। তিনি তখন গভীর ঘুমে অচেতন।

রাত ১২টার পরে ঝিনাইদহ শহর সাধারণত নিরব থাকে। আজও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে রাস্তায় মারজানের চলাটা তার নিজের কাছেই অদ্ভূত মনে হচ্ছে। হাঁটছে আর ভাবছে মারজান। কেন এমন হল? তার এখনকার কাজটা কী ঠিক হচ্ছে? হাসপাতালে বাবা ঘুমিয়ে আছেন। সে বাবার পকেট থেকে দুটো পাঁচশ টাকার নোট নিয়ে এসেছে। বাবা টের পাননি। বের হওয়ার সময় অবশ্য একটা নার্সের মুখোমুখি হতে হয়েছে তার। নার্সকে কিছু বলতে না দিয়েই মারজান বলেছে, 'সিস্টার, আমি একটু বাইরে থেকে আসছি।' বুক টিপ টিপ করছে মারজানের। এখন এত রাতে সে কোথায় যাবে? মায়ের কথা দাদীর কথা মনে পড়ছে তার। এই রাত শেষেই তার বাড়িতে যাওয়ার কথা। অথচ কোথায় অজানার উদ্দেশ্যে ছুটছে সে। ভাবনার এক কালো পাহাড় মারজানের মাথায় ভর করলো। জীবনের চরম বাস্তবতা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। কোথায় পাবে সে থাকার জায়গা, কোথায় ঘুমাবে? কে বহন করবে তার খরচ? ভাবতে ভাবতে নিজকে নিজেই ধিক্কার দিল মারজান। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। শুরু করল উল্টো পথে হাঁটা। 'আপতত বাড়ি যাওয়া যাক' ভাবল সে। তার পরে সুযোগ বুঝে যথাযথ প্রস্তুতি-পরিকল্পনা নিয়েই প্রয়োজন হলে পালাবে সে।

হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গিয়েছিল সে। হাসপাতালের কাছাকাছি চলে এসেছে। এমন সময় কে একজন পেছন হতে ডাক দিল, 'এই ছেলে দাঁড়াও'। চোখ ঘুরাবার আগেই ঘটে গেল ঘটনাটি। নাকে, মুখে রুমাল চেপে ধরল লোকটি। জ্ঞান হারাল মারজান।  



পর্ব-২
ঠিক রাত তিনটার সময় ঘুম ভাঙলো মারজানের বাবা আরমান আলীর। এত রাতে মারজানের বিছানা খালি দেখে অবাক হলেন তিনি। ভাবলেন, বোধ হয় বাথরুমে গেছে ছেলেটা। কিন্তু কেবিনের দরজার দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলেন, দরজা পুরোপুরি খোলা। দ্রুত বাথরুম চেক করলেন আরমান আলী। না, মারজান বাথরুমে নেই। কেবিনের সম্মুখস্থ করিডোরে চোখ রাখলেন, কেউ নেই। নার্স রুমের সামনে গেলেন তিনি। দু'জন নার্স সারা রাত ডিউটি করে কাতর হয়ে ঘুমোচ্ছে। কী যেন ভাবলেন আরমান আলী, তারপরই অন্যদিকে ছুটলেন। হাসপাতালের চতুর্দিক তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখলেন তিনি। কোথাও মারজানের দেখা না পেয়ে আবার ঘুরে এলেন ডিউটিরত নার্সদের সামনে। ততক্ষণে ফজরের আযান দেওয়া শুরু হয়ে গেছে বিভিন্ন মসজিদে। আরমান আলী অপেক্ষা না করে অস্থির হয়ে ডাকলেন নার্সদেরকে। সব শুনে একজন নার্স বলল, 'ও ফিরে আসেনি?' আরমান আলী বিস্মিত কণ্ঠে জানতে চাইলেন, 'ফিরে আসেনি মানে? আপনি কী ওকে কোথাও যেতে দেখেছেন?' নার্স বিনয়ের সাথে জবাব দিল, 'জ্বি আংকেল, আমি একটি ছেলেকে বাইরে যেতে দেখেছি। ও আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই দ্রুত চলে যায়।'

পুরো আকাশটা আরমান আলীর মাথায় ভেঙে পড়ল। মারজান এভাবে চলে গেল কেন? ফোন দিলেন, বাড়িতে এবং আত্মীয় স্বজনদের কাছে। কিন্তু সকলেই অবাক হওয়া ছাড়া কোন সন্ধান দেতে ব্যর্থ হল। এত রাতে অচেনা এক শহরে এতটুকু একটি ছেলে কীভাবে চলে গেল? এক সাগর চিন্ত আরমান আলীর ব্লাড প্রেসারকে হাই করে তুলল। শেষে তিনি ধরে নিলেন, মারজান হয়তো কোন প্রয়োজন কিংবা এমনিতেই হাসপাতাল থেকে বাইরে বের হয়েছিল। কেউ তাকে অপহরণ করেছে হয়তো। অথবা রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে, তাই ফিরে আসতে পারেনি। অন্যদিকে ভোর বেলা মোবাইল ফোনে মারজান হারানোর সংবাদে তার মা ও দাদী কেঁদে অস্থির হয়ে গেলেন। সবাই মিলে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলেন, আল্লাহ যেন তাদের অবুঝ এই সন্তানটিকে ফিরিয়ে দেন। আরমান আলী পরদিনই পত্রিকায় নিখোঁজ সংবাদ ছাপালেন। থানায় জিডি করলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হল না। কারণ এ জাতীয় ঘটনা বাংলাদেশে প্রতিনয়তই ঘটে থাকে। তাই মারজান হারানোর বিষয়টা কোনভাবেই তার পরিবার, আত্মীয় এবং বন্ধুবান্ধব ছাড়া কারো কাছেই কোন গুরুত্ব বহন করলনা।

মারজান চোখ খুলেই নিজেকে একটি অন্ধকার রুমে আবিষ্কার করল। চারদিকে কালো অন্ধকারের মধ্যে সে কিছুই দেখতে পেলনা। চোখদ্বয় ঝিমঝিম করতে লাগল। এই সময় সে কাউকে মোবাইলে আলাপ করতে শুনল, 'বস, ছেলেটির জ্ঞান ফিরেছে।' ধীরে ধীরে সব ঘটনা মনে হতে লাগল মারজানের। চোখে হাত দিয়ে বুঝল তার চোখ বাঁধা। সে অনেকটা গোঙানির স্বরে বলল, 'আ-মি কো---থা--য়? আ--মা-র চো---খে---র বাঁ---ধ-----খু----লে -----দা--ও।' ততক্ষণে একটি লোক মারজানের নিকটে এসে বলল, 'তুমি তো দেখছি বেশ শান্তভাবেই কথা বলছো। এই আজাদ, ওর চোখের বাঁধনটা খুলে দেয় তো।' মারজান ওদের কথাবার্তায় স্পষ্টই বুঝতে পারল যে সে এখন ছেলেধরার হাতে বন্দী। ভয়ে তার বুকটা কেঁপে উঠল। ছেলেধরা নামটা তার কাছে সবসময় হাস্যকর মনে হত। অথচ এখন সে অনুভব করছে আসলেই এরা বিপজ্জনকই হয়। মনে মনে আল্লাহর সাহায্য চাইতে লাগল মারজান।

আজাদ নামক লোকটি মারজানের চোখের বাঁধন খুলে দিলে ধীরে ধীরে সে সবই দেখতে পেল। দেখতে পেল সে কোন ঘরে বন্দী নয়, বরং খোলা আকাশের নিচে নৌকায়। এসময় আজাদ যাকে 'বস' সম্বোধন করেছিল সেই জঙ্গী টাইপের লোকটি বলল, 'ভয় নেই আজাদ, আমরা সীমান্ত পার হয়ে অনেক দূরে চলে এসেছি। এখন অন্তত গুলির মুখে পড়তে হবেনা।' যে মারজান সময় দুষ্টুমি করে সময় কাটাতো, মা-বাবার কথা শুনতো না, সেই মারজানের মনে আজ ভীষণ ভয় ঢুকলো। চরম বিপদ নিজেই সে ডেকে এনেছে, ভাবল মারজান। তাই এখন করণীয়টাও তাকেই নির্ধারণ করতে হবে। যেহেতু সীমান্ত পার হয়ে মানে দেশের বাইরে চলে এসেছে, সুতরাং সহসাই কেউ তাকে বাঁচাতে আসবে বলে মনে হয়না। তাই অনেক ভেবে চিন্তে মারজান কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে ওদের কাছে জানতে চাইল, 'তোমরা কারা? আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?' আজারদ হাসতে হাসতে বলে উঠল, 'দেখেছেন বস, ছেলেটার বয়সই বা কত হবে? এর মধ্যে ভয়-ডর কিছু আছে বলে মনে হয় না।' বস জবাবে বলল, 'আমি তো কাল রাতে ওকে একা শহরে হাঁটতে দেখে এটাই অনুমান করেছিলাম। আর সেজন্যই ওর জন্য এই ব্যবস্থা।' লোকটির এ কথা শুনে মারজানের মনে সাহস আরো কিছু বর্ধিত হল। সে বলল, 'কী হল, আমার প্রশ্নের জবাব তো পেলাম না?'

'মানুষের কিডনি, কলিজা, চক্ষু ইত্যাদি বিক্রি করে আমরা জীবিকা নির্বাহ করি। আমরা একটি আন্তর্জাতিক শিশু পাচারকারী দলের সদস্য। প্রতি মাসে কমপক্ষে ৫০ জন শিশু আমরা দেশের বাইরে পাচার করি। বাকীদের কেটে ফেলি। আশা করি তোমার প্রশ্নের উত্তর তুমি পেয়ে গেছো খোকা?' বলল আজাদের বস শফিক। মারজানের মনে হল লোকটি এতক্ষণ কিছু মুখস্ত বুলি আওড়াল। তবে সে এ বিষয়ে নিশ্চিত যে, আজ এদের হাত থেকে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই তাকে উদ্ধার করতে পারবে না। তাই আবারও মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে লাগল সে। চোখ বন্ধ করে ভাবল কিছুক্ষণ। তার পর ঝাঁপ দিয়ে নিজের দেহটাকে নৌকার বাইরে ফেলে দিল। নদীর পানিতে 'ঝপ্পাস' করে আওয়াজ হল। শিকার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে দেখে আজাদ সাথে সাথে ধারালো একটি ছুরি মারজানকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিল। মারজান পানিতে পড়েই গ্রামের পুকুরে এবং নদীঘাটে প্র্যাকটিস করা ডুব সাঁতার দিতে শুরু করেছিল। আজাদের ছুরিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হল না তবুও। গেঁথে গেল মারজানের পিঠে। পানির নিচে সাতাররত অবস্থাতেই কঠিন যন্ত্রনা অনুভব করল সে। নদীর ঢেউয়ের সাথে তলিয়ে গেল মারজান। সাদা পানিতে ভেসে বেড়াতে লাগল তার শরীরের টাটকা লাল রক্ত। এ সময় দু'টি যাত্রীবাহী বোট এদিকেই আসছে দেখে পিছু হটে গেল আজাদেরা। 



পর্ব-৩
ঘনিষ্ঠ বন্ধু মারজানের নিখোঁজ হওয়ার সংবাদে ব্যথিত হয়ে উঠল আরিফুল ইসলাম বাঁধন। মারজানকে না পেয়ে ভীষণভাবে একাকিত্ব বোধ করতে লাগল সে। আসলে প্রতিবেশি এবং ক্লাসমেট হওয়ার কারণে দুজনে খুবই আপন ছিল। একজন আরেকজনের মুখের আইসক্রীম পর্যন্ত ভাগাভাগি করে খেত ওরা। শুধু স্বভাবগত দিক থেকে মারজানের চেয়ে কিছুটা শান্ত প্রকৃতির ছিল বাঁধন। বাবা-মা'র অবাধ্য হতো না কখনোই।

স্কুলে গ্রীষ্মকালীন ছুটি ঘোষিত হল। বাঁধন কোন অবস্থাতেই মারজানকে ছাড়া এ ছুটি উপভোগ করতে পারছিলনা। হতাশার কালো মেঘে ঢাকা পড়ল তার আনন্দ। বাবা-মা তাকে তার নানা বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। বাঁধনের মামাবাড়ি ঝিনাইধহ শহরেই। মামাতো ভাই আতিকও পড়ে ওদেরই সাথে ক্লাস এইটে। বাঁধনের মা-বাবার ধারণা বন্ধু মারজানের অভাব হয়তো ও কিছুটা পূরণ করতে পারবে। অনেকটা তাই হল। তাদের দুজনের মধ্যে অপূর্ব সম্পর্ক তৈরি হল। আতিক বলল, ' আসলে তোর বন্ধু মারজানের জন্য আমাদের একটা কিছু করা দরকার।'
'তুই ঠিকই বলেছিস। কিন্তু করবটা কী? বাঁধন হতাশার সুরে জবাব দিল।
'গোয়েন্দাগিরি করব। আমাদেরকে গোয়েন্দা হতে হবে।' আতিকের চোখে আনন্দ।
'দেখ আতিক, গল্প আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য আছে। আমরা গল্পের মধ্যে যেভাবে দেখি তিন গোয়েন্দা, দুই গোয়েন্দা অত্যন্ত জটিল সমস্যার সমাধান করে ফেলে, বাস্তবে কিন্তু সেরকম কিছু করা সম্ভব নয়। '
'দূর, তুই বাস্তবের দেখেছিস কি?' শোন আমরা চেষ্টা করে দেখি। চেষ্টা করে যদি কিছু করতে না পারি তখন বাস্তবতার অজুহাত দেখাবো।' আতিকের কথাটি বেশ আকৃষ্ট করল বাঁধনকে। সেই সাথে সে পুলকিত হল খানিকটা।

পরদিন সকালে দুজনে ঝিনাইধহ সদর হাসপাতালে গেল। পার্শ্ববর্তী এলাকাটি পর্যবেক্ষণ করে দেখল। ফেরার পথে বাঁধন জানতে চাইল, 'কি লাভ হল হাসপাতাল ঘুরে?' আতিক মাথা নাড়িয়ে জবাব দিল, 'লাভ-ক্ষতির হিসাব করে গোয়েন্দাগিরি হয়না। মারজানের সন্ধান পেতে আর বেশি দেরি হবে না।'
'কি আশ্চর্য! কিছুই যখন জানা গেল না, তখন তুই কী করে বলছিস দেরি হবেনা?'
আল্লাহ ভরসা। আমরা শীঘ্রই মারজানকে পেতে যাচ্ছি। তুই শুধু আমাকে সাপোর্ট করে যাবি।' আতিকের কথায় আশান্বিত হল বাঁধন। বলল, 'সাপোর্ট তোকে অবশ্যই করবো। তাছাড়া মারজান আমার বন্ধু। ওর জন্য আমার দায়িত্বটুকু তো পালন করতেই হবে।'

ওই দিন রাতে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের সম্মুখে একটি ছেলেকে একা একা পায়চারি করতে দেখা গেল। রাত বারোটা থেকে তিনটা পর্যন্ত শহরের এ মাথা ও মাথা চক্কর দিল ছেলেটি। শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে গেল। দুচোখে ঘুম এলনা তবুও আতিকের। সে অনেক গোয়েন্দা কাহিনী পড়েছে। প্রতিটি কাহিনীতে বিশেষ করে কিশোর গোয়েন্দা কাহিনীগুলো পড়ার সময় কল্পনায় সে নিজের কথা ভাবতো। এখন এত বড় সুযোগ হলোয় নষ্ট করা ঠিক হবেনা। ভাবল আতিক হাসান।

আতিক অনুমান করেছিল মারজান নিজে থেকে কোথাও হারিয়ে যায়নি এবং তাকে যে বা যারা কিডন্যাপ করেছে তারা তাকে এই সদর হাসপাতালের সামনে থেকেই করেছে। এর মানে রাতে এখানে ছেলেধরাদের আনাগোনা আছে। আর তাই সে নিজে কাউকে না জানিয়ে গভীর রাতে এই রাস্তাতে হাঁটতে শুরু করেছিল। ভাবছিল নিজে ধরা খাবে ওদের হাতে, তারপর কৌশলে বের করবে মারজানের সন্ধান। কিন্তু ও জানেনা, সব অনুমান সত্যে পরিণত হয় না। সে ছোট মানুষ, তাছাড়া আগে কোনদিন এসমস্ত কাজে জড়িত হয়নি। পরপর তিন রাত আতিক এভাবে চেষ্টা করে ব্যর্থ হল। এক রাতে পুলিশের হাতে তো প্রায় ধরা পড়েই গিয়েছিল।



৪র্থ পর্ব
এর কিছুদিন পর বাঁধন তার গ্রামের বাড়িতে চলে গেল। একটা বিষয় বাঁধনকেও চিন্তিত করে তুলেছিল। গোয়েন্দা কাহিনী সে ও কম পড়েনি। এমন কি নিজে একটি গোয়েন্দা কাহিনী টাইপের গল্প লিখেছে পর্যন্ত। মাসিক ফুলকলি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল সেটা। অথচ ওরা দু'জনে মিলে মারজানকে উদ্ধার করার কোন সূত্রই বের করতে পারলনা। বাড়ি ফিরে বাঁধনের মনে হল বিষয়টি তার অন্যান্য বন্ধুদের জানানো দরকার।

গ্রীষ্মের ছুটি শেষে আবার স্কুল শুরু হল। সবাই জড়ো হল স্কুল গেটের উল্টোদিকের বটতলাতে। এখানেই মারজানের নেতৃত্বে আড্ডা দিত বিশ্বচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্ররা। কথাটা বাঁধনই শুরু করল প্রথমে। তারপর অন্যরাও এ বিষয়ে প্রচুর আগ্রহ দেখাল। সবাই মোটামুটি একমত হল তারা একটা গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করবে। সংস্থা মানে একটা ছোটখাটো কমিটি। সর্বমোট ছয়জনকে নিয়েই এই কমিটি গঠিত হবে, সিদ্ধান্ত হল। বাঁধন ইচ্ছে করেই তার মামাতো ভাই আতিক হাসানের বিষয়টি এখানে বলল না। পরের শুক্রবার সবাই একত্রিত হল মারজানের বাড়িতে। মারজানের পড়ার কক্ষে বসেই আলোচনা শুরু করল তার। তাদের উদ্দেশ্য জানতে পের মারজানের মা-বাবা, দাদীসহ পাড়ার সকলেই খুশি হলেন।

বাঁধন বলল, 'প্রথমেই আমাদের বুঝে নিতে হবে কার কি দায়িত্ব?'
'তাতো অবশ্যই এবং আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে একটি শৃঙ্খলিত পদ্ধতিতে। মনে রাখতে হবে কেউ যেন আমরা নিজেদের দায়িত্ব পালনে গাফলতি না দেখাই।' বাঁধনের কথার পিঠেই কথাগুলো জুড়ে দিলে বাহার।

বাঁধন আবার শুরু করল, 'আমাদের ধারণা মারজান ছেলেধরাদের হাতেই পড়েছে। কারণ শহরে গত দুই মাসে পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী ৪ শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা আছে। পত্রিকায় আসেনি এরকম ঘটনা থাকাটও অস্বাভাবিক নয়। অথচ প্রশাসন এ ব্যাপারে কিছুই করতে পারছে না।' ওর কথা সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। কথা শেষ হতেই আশিক আকবর বলল, 'বুঝলাম মাননীয় সভাপতি, তা এখন কি বলবেন যে আমাদের মধ্য থেকে কাকে আপনি সেক্রেটারি হিসেবে বেছে নিবেন?'
'কিসের সভাপতি-সেক্রেটারি, আমরা সবাই বন্ধু এটাই আমাদের পরিচয়। এখানে আমরা রাজনীতি করতে আসিনি। তবে অফিসিয়াল কিছু নিয়ম আছে। যেনম চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যে কোন একজন দেবে। আমার মনে হয় এ দায়িত্বটা অর্থাৎ গোয়েন্দা প্রধান পদটা আমরা আশিক আকবরকেই দেই।' বলল বাঁধন। প্রতিবাদ জানাল আবু তাহের বাহার। বলল, 'এ হয় না, গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে আমরা তোকেই মেনে নিয়েছি।' ওর কথায় সবাই সায় দিল। বাঁধন একটু ঠিকঠাক হয়ে বসল। বলল, 'ঠিক আছে সবাই একমত হলে আমি তো আর না করতে পারি না। আমার সাথে চীফ এসিস্ট্যান্ট হিসেবে আমি আশিক আকবরকে চাই। ওর সহযোগিতা আমার প্রতি মুহূর্তে দরকার পড়বে। বাকি সবাই আমাদের টিমের এক্সিকিউটিভ মেম্বার, কেমন?' সবাই করতালির মাধ্যমে তাদের স্বাগত জানাল। সিদ্ধান্ত হল প্রতি শুক্রবার তাদের এই গোয়েন্দা বাহিনীর মিটিং বসবে। গোয়েন্দা দলের একটি নামও ঠিক হয়ে গেল ওই দিন। 'মারজান গোয়েন্দা বাহিনী'। নামটি প্রস্তাব করেছিল সায়িদ প্লাবন। সবাই সেদিনের মত বিদায় নিল। সকল কিশোরের মনে তখন অ্যাডভেঞ্চার অ্যাডভেঞ্চার ভাব। 





৫ম পর্ব
শিউলির মা নদীর ঘাটে পানি নিতে এসেছেন। শিউলিও সাথে এসেছিল। হঠাৎ শিউলি চিৎকার দিয়ে উঠলো, 'মা দেখ, একটা মরা মানুষ! পিঠে চাক্কু গাঁথা।' শিউলির মাও দেখে আঁৎকে উঠলেন। দুজনে নিকটবতী হল লাশটির। মৃত ছেলেটার পিঠে রক্তের খাবলা দেখে শিউরে উঠল শিউলি। তার শরীর কেঁপে উঠল। কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারিত হল, 'মা, ওকে এভাবে কে মারল?'

প্রশ্নের জবাব দিলেন না শিউলির মা। কারণ তার মনেও তখন একই প্রশ্ন। ছেলেটির চেহারা দেখে মনে হল আগে কোথাও দেখেছেন তিনি। পূবাকাশে সূর্য উপরের দিকে এগোচ্ছে। চারদিকে সবুজ ফসলের খামার। এরই এক পাশে কুশিয়ারা নদীর চরে পিঠে ছুরি গাঁথা একটি ১৩-১৪ বছরের কিশোর! কী অস্বাভাবিক ঘটনা। ঘটনার আগা-গোড়া কিছুই না বুঝে শিউলির মা বলল, 'যা শিউলি, তাড়াতাড়ি তোর বাবাকে ডেকে নিয়ে আয়।' শিউলির বাবা পেশায় শ্রমিক। একেবারে দিন মজুর। অন্যের বাড়িতে কাজ করেই সংসার চালান। তবে এই নদীর চরে যে ক্ষেত খামার তাদের আছে তা দিয়েই মোটামুটি এলাকার মধ্যে অবস্থান ধরে রেখেছেন। রহম আলী মানুষ হিসেবেও খারাপ না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। লেখাপড়া না জানলেও তাকে কিন্তু অক্ষর জ্ঞানহীন বলে মনে হয় না। প্রতিদিন ফজরের নামাজ থেকে এসে সুর করে কুরআন তেলাওয়াত করেন।

প্রতিদিনের মতো আজও রহম আলী কুরআন তেলাওয়াত শেষ করে বাইরে বেরোতে যাবেন এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে শিউলি এসে ডাক দিল, 'বাবা, ও বাবা; জলদি এসো। নদীর চরে একটা মরা ছেলে পাওয়া গেছে।' রহম আলী দ্রুত নদীর চরের দিকে ছুটলেন। সবকিছু দেখে ছেলেটিকে নিয়ে হাসপাতালে চলে গেলেন। তার ধারণাই ঠিক হল। ডাক্তার বললেন, 'ছেলেটি এখনও বেঁচে আছে। সারা শরীরে ওই একটাই জখম, প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। আমরা রক্ত দিচ্ছি। আশা করি খুব শীঘ্রই ছেলেটির জ্ঞান ফিরে আসবে।' 
 
 
undefined

ছেলেটি বেঁচে আছে জানতে পেরে রহম আলী আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া জানালেন। একই সাথে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলেন ওকে দ্রুত সুস্থ করে দেওয়ার জন্য। 'এমন ফুটফুটে একটি কিশোর, কে ওর এমন অবস্থা করল?' ভাবছিলেন রহম আলী। এদিকে কিছুক্ষণের মধ্যে মারজানের জ্ঞান ফিরে এলে সে সব কিছু আন্দাজ করার চেষ্টা করল। প্রথমে কিছুই মনে করতে পারছিল না। ধীরে ধীরে তার সব মনে পড়ে গেল। রহম আলী তাকে বাড়িতে নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার নাম কী বাবা?'
'আল মারজান' জবাবে জানাল ছেলেটি। তারপর সে জানতে চাইল, 'আমি কোথায়, এখানে কীভাবে এলাম?' 'তুমি এখন সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রামে' বলে বিস্তারিত জানালেন রহম আলী। তারপর জানতে চাইলেন, 'ঘটনা কীভাবে ঘটল?'

মারজান ভাবল, যে উদ্দেশ্যে সে হাসপাতাল থেকে পালিয়েছিল সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আল্লাহ সম্ভবত তার মনের আশা পূরণ করার জন্য এই ব্যবস্থা নিয়েছেন। তাই সে সিদ্ধান্ত নিল তার পরিচয় গোপন রাখবে। বাড়িতে না গিয়ে চেষ্টা করবে এদিকে কোথাও থেকে যাওয়ার। সে রহম আলীকে বলল, 'আমার কেউ নেই। ঢাকায় এক চাচার বাসায় থাকতাম। চাচার ছেলেরা ভবিষ্যতে আমি তাদের সম্পত্তির অংশীদার হয়ে যাব ভেবে আমাকে খুন করতে চেয়েছিল। তারা আমার চোখ বেঁধে কোথায় নিয়ে গিয়েছিল জানি না। এক সময় একটি নদীর তীরে আমাকে ছুরি দিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করলে প্রাণ বাঁচাতে আমি নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ি।'

মিথ্যে বলায় ওস্তাদ ছিল মারজান আগেই। তাই এই বিপদ বা সংকটের সময়েও তার মুখের মিথ্যা কথাগুলো রহম আলী ও তার বাড়ির সকলের হৃদয়কে আবেগাপ্লুত করে তুলল। ওর কথাগুলো অবিশ্বাস করা কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না। রহম আলী আবেগ মাখানো কণ্ঠে বললেন, 'তুমি কোন চিন্তা করো না। এখন থেকে তুমি আমারই ছেলে। তোমার কোন ভয় নেই, তুমি আমার এখানেই থাকবে। ভালই হল, আমার কোন ছেলে নেই। এখন থেকে আমার এক ছেলে এক মেয়ে।'

শিউলি বলে উঠল, 'মারজান ভাইয়া, আমার সাথে খেলতে হবে কিন্তু।'
'অবশ্যই বোন আমার, তোমার সঙ্গে না খেললে আমি সময় কাটাবো কীভাবে?' হেসে বলল মারজান। সেদিন থেকেই মারজানের নতুন জীবন শুরু হল। মারজান রহম আলীকে জানালো সে ক্লাস এইট পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। তাই নতুন বছরে রহম আলী তাকে এলাকার 'করামত আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে' নবম শ্রেণীতে ভর্তি করার ব্যবস্থা নিলেন। স্কুলে ভর্তি হবার অতি অল্প দিনেই মারজান স্কুলের সব ছেলেদের সাথে ভাব করে ফেলল। কিন্তু তার আগের সেই দুষ্টুমি করার অভ্যাসটা সে একেবারে হারিয়ে ফেলল। এখানে সে যদিও রহম আলীর বাড়িতে নিজের বাড়ির মতোই থাকে, তবুও বারবার তার মায়ের কথা মনে পড়ে। দাদীর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে বন্ধু বাঁধনসহ সকলের কথা।

এক রাতে মারজান স্বপ্নে দেখল তার মা মারা গেছেন। মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহুর্তে মা তাকে বলছিলেন, 'তুই আমার পেটের ছেলে হয়ে এ কাজ করতে পারলি? আমাদের ছেড়ে তুই কোথায় আছিস একটাবার জানালেও পারতিস।' স্বপ্নে সে আরো অনেক কিছুই দেখল কিন্তু ঘুম ভাঙার পর তার আর কিছুই মনে থাকল না। কেবল মনে থাকল মায়ের মৃত্যুর কথা। সেদিন স্কুলে গিয়ে মারজান ক্লাসে মন বসাতে পারলনা। বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় তুহিন জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার মারজান? তোমার কী শরীর খারাপ?' তুহিন মারজানের নতুন বন্ধু। কিন্তু এখানে কেউ এখনও মারজানকে 'তুই' সম্বোধন করে কথা বলে না। মারজান একটি্ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'না, শরীর ঠিকই আছে, তবে মনটা খুব খারাপ।'
'কিসের জন্য মন খারাপ, জানতে পারি কী?' বলে মারজানের কাঁধে হাত রাখল তুহিন। 'দু:খিত' বলে হাতটা ছাড়িয়ে নিল মারজান। তুহিন মনে মনে অপমান বোধ করলেও মুখে কিছুই বলল না। তার মনে পড়ল বড় ভাই শাহীনের কথা, 'কেউ তোমার সাথে খারাপ আচরণ করলেও তুমি তাকে ভাল আচরণের মাধ্যমে জয় করার চেষ্টা করবে।' অবশ্য সে দৃষ্টি থেকে মারজান তেমন কোন খারাপ আচরণ করেনি তার সাথে। তবুও স্কুলে মারজান তুহিনের ক্লাসমেট হওয়াতে একজন আরেকজনের কাছে সুখ-দু:খ শেয়ার করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মারজানের আচরণটা সেরকম ছিল না।

তুহিনের বড় ভাই শাহীন ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। সে থাকে সিলেট শহরে। সেদিন একুশের ফেব্রুয়ারিতে বাড়ি এসে জানাল, সিলেট শহরে একটি কিশোর গোয়েন্দা টিম এসেছে। তারা নাকি তাদেরই এক হারানো বন্ধুকে উদ্ধারের জন্য এই গোয়েন্দা টিম গঠন করেছে। এই চাঞ্চল্যকর খবরটি এলাকায় বিশেষ করে করামত আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না। স্বাভাবিভাবেই এ খবরটা মারজানকে বিচলিত করে তুলল। ওরা কি তাহলে আমারই বন্ধু? জানতে হবে ওরা কোথা থেকে এসেছে? 
 
 
 
undefined

পর্ব-৭
পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আল মারজান গোয়েন্দা বাহিনীর একটি গ্রুপ ঢাকায় গিয়ে পৌছলো। এ গ্রুপের নেতৃত্বে ছিল আশিক আকবর। সাথে ছিল প্লাবন সায়িদ ও আবু তাহের বাহার। বাহারের খালার বাসা ধানমন্ডির ২৫ নম্বর রোডে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানেই উঠলো তারা তিনজন।
অনেক খোঁজাখুজির পর হতাশ হয়ে পড়ল তিন গোয়েন্দা। কোন ক্লু তাদের সামনে ধরা দিলনা। 'রাজধানী ঢাকায় তন্ন তন্ন করে খুঁজেও মারজানকে পাওয়া যাবে না' বুঝতে পারল ছেলেরা। তাই এক সপ্তাহ পর জন্মভূমি ঝিনাইদহে ফিরে গেল তারা। রিপোর্ট করল গোয়েন্দা প্রধানকে। গোয়েন্দা প্রধান আরিফুল ইসলাম বাঁধন এতে হতাশ হল না একটু্ও। বরং এই বলে ওদের সান্তনা দিল যে, 'তোদের এই সফর ভবিষ্যতে আমাদের গোয়েন্দাগিরিতে অনেক কাজে লাগবে।'
'তা না হয় লাগবে। কিন্তু এখন যে কেস নিয়ে আমরা কাজ করছি তার কী হবে?' বলল বাহার। 'সমাধান তো অবশ্যই একটা হতে যাচ্ছে।' বলে ভাবতে লাগল বাঁধন। ওর এই চেহারাটা সকলের কাছেই পরিচিত। যখন কোন বিষয়ে খুব বেশি চিন্তা করে তখন ওকে এমন দেখায়। মনোভাব বুঝতে পেরে নীরব থাকল বন্ধুরা। এমন সময় মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল বাঁধনের। অন্যমনস্ক ছিল সে, তাই ফোনটা রিসিভ করল আশিক আকবর।
'হ্যালো আল মারজান প্রধান?'
'না, আমি এ্যাসিস্ট্যান্ট। ওদিকের খবর কী আখলাক?'
'খবর খুব সাংঘাতিক। জানতে পারলাম সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় একটি অজ্ঞান ছেলেকে নদীর তীরে পাওয়া গেছে কিছুদিন আগে। বর্তমানে সে গ্রামের এক কৃষক পরিবারে বসবাস করছে। এখানকার একটি স্কুলে ও ক্লাস নাইনে এডমিশন নিয়েছে।'
'তোমরা এখনও সেই স্কুলে যাওনি?'
'না, আমরা আসলে অন্য একটা প্রবলেমে আছি। আমাদের শখের গোয়েন্দা প্রাহীকে পাওয়া যাচ্ছে না।'
'বলিস কী'?
'আজ সকালে প্রীতিরাজ রেস্টুরেন্টে নাস্তা করতে গিয়েছিলাম। এটা সিলেটের জিন্দাবাজার এলাকা। মূল শহর। নাস্তা শেষে সবাই একসাথে বের হলাম। ও যে কোনদিকে গেল কেউ খেয়াল করতে পারিনি।'
'ফোন ছিল না ওর সাথে?'
'না, ওকে তো এখনও ফোন ব্যবহার করতে দেয় না ওর বাবা-মা। তাছাড়া ও মুক্ত থাকলে তো যে কোন দোকান থেকে আমাদের ফোন করতোই।'
'তার মানে তুই বলছিস, মারজানকে উদ্ধার অভিযনে গিয়ে প্রাহীকে হারাতে হচ্ছে!'
'না, ঠিক তা না। এখনও সন্ধ্যা হয়নি, ও কোথায় গেছে কে জানে? চলে আসবে হয়তো এক্ষুণি!'
'শোন আখলাক, বিষয়টা খুবই সেনসেটিভ। প্রাহীর কিছু হলে আমাদের কাউকে ছেড়ে দেবে না ওর বাবা-মা।'

(বাকী অংশ পড়তে ৮ম পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন।)
  

   

আমরা আসলে বাংলাদেশি বাঙালি

অনেক দিন থেকেই ভাবছিলাম এ বিষয়টি নিয়ে লিখব, কিন্তু সময় করে উঠতে পারছিলাম না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে নিজেদের জাতীয়তাবাদের এই দ্বন্ধ আমার মোটেই পছন্দ নয়। সম্প্রতি সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত সুপ্রীম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে মূল সংবিধান বা ৭২ এর সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলা হলেও দীর্ঘদিন বাংলাদেশি হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙনে পরিচিতি লাভ করায় এবং পাসপোর্ট সহ সকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে বাংলাদেশি কথাটি উল্লেখ থাকায় নাগরিকত্বের পরিচয়ে আমরা বাংলাদেশি বলে গণ্য হবো।

ভাবতে অবাক লাগে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রটি যিনি প্রতিষ্ঠা করলেন (আসলে যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হলো) তিনি অর্থাৎ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও বাঙালি জাতির জনক বলা হয়। অথচ পশ্চিম বঙ্গ নামে একটি রাজ্য আছে ভারতে এবং সেখানকার অধিবাসী বা আয়তন কোন অংশেই বাংলাদেশের চেয়ে কম নয়। তাহলে কী আমাদেরকে ধরে নিতে হবে এপার বাংলা এবং ওপার বাংলা মিলে যে বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধু সেই জাতির জনক! নিশ্চয়ই না। তার মানে তিনি আসলে বাংলাদেশি জাতির জনক। মরহুম জিয়াউর রহমান যে বাংলাদেশি জাতিয়তাবাদ আবিষ্কার করেছিলেন, সেটাকে এখন আর শুধু দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়। ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে বাংলাদেশ আমরা পেলাম, সেই বাংলাদেশে কেবল বাঙালি নয় বিভিন্ন উপজাতিদেরও বসবাস রয়েছে। যদি বঙ্গবন্ধুকে আমরা বাঙালি জাতির জনক বলি তাহলে চাকমা বা পাহাড়িসহ বিভিন্ন উপজাতির মানুষগুলোর জাতির জনক কে হবেন? নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ভাষাগত দিক থেকে আমরা বাঙালি আর রাষ্ট্রীয় ভূখন্ডগত অবস্থানের দিক থেকে আমরা বাংলাদেশি। অতএব আমাদের পরিচয় হবে আসলে বাংলাদেশি বাঙালি। যারা ধর্মভিত্তিক জাতীয়তা নিয়ে হইচই করেন তাদেরকেও আমরা এখানে রাখতে পারবো। যেমন- ব্যক্তিগতভাবে ধর্মীয় পরিচয়ে আমি একজন মুসলমান। ভাষাগত দিক থেকে আমি বাঙালি। আর রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে আমি অবশ্যই বাংলাদেশি। তাই আমার পরিচয় আমি একজন বাংলাদেশি বাঙালি মুসলমান।

সুতরাং রাজনৈতিক কারণে বিতর্ক নয়, বাস্তবতায় আসুন। নিজেদের জাতীয় পরিচয় নিয়ে অন্তত আমরা ঐক্যবদ্ধ হই এটাই প্রত্যাশা।

বেকারত্বঃ যেখানে লুকিয়ে রয়েছে সীমাহীন সম্ভাবনা

পৃথিবীর মানচিত্রে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম অথচ একটি অপার সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। বর্তমানে এ দেশে প্রায় ১৫ কোটি লোকের মধ্যে ৪৪% লোকই দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে। এ দেশে শিক্ষিতের হার ৬৫% হলেও দেশের মোট জনশক্তির প্রায় এক তৃতীয়াংশ কর্মসংস্থানের অভাবে বেকারত্বের জীবন যাপন করছে যাদের অধিকাংশই শিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত কিংবা কমপক্ষে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন। যদিও বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ এবং এখানকার জনসংখ্যার প্রায় ৭০% এখনও নানাভাবে কৃষি তৎপরতার উপর নির্ভরশীল, তথাপি সঠিক দিক নির্দেশনা এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবে কৃষি খাতকে ভিত্তি করে এখন পর্যন্ত এ দেশে চোখে পড়ার মতো কোন প্রকল্প তৈরি হয়নি। তেমনিভাবে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, মৎস সম্পদ, বনজ সম্পদ, স্বাস্থ্য সেবা, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং বিশেষ করে শিক্ষা আন্দোলনে জাতি এখনো কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। যার ফলে দেশের অন্যতম বড় সম্পদ 'জনসংখ্যা' এখন বড় ধরনের একটি সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশায় ভুগছে।

বেকারত্ব সম্পর্কে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মত রয়েছে। তবে অধিকাংশ অর্থনীতিবিদদের ধারণার আলোকে বলা যায়, বেকারত্ব বলতে এমন অবস্থাকে বুঝায় যাতে কর্মক্ষম শ্রমিকরা প্রচলিত মজুরীতে কাজ করতে ইচ্ছুক হওয়া সত্তেও তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কোন কাজ পাওয়া যায় না। এখানে 'বেকারত্ব' বলতে অনিচ্ছাকৃত বেকারত্বকেই বুঝানো হয়েছে। অধ্যাপক পিগুর ভাষায়, 'ঐ অবস্থাকেই বেকারত্ব বলা হয় যখন কর্মক্ষম ব্যক্তিরা ইচ্ছা থাকা সত্তেও যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পায় না।' এখানেও অনিচ্ছাকৃত বেকারত্বের কথাই বলা হয়েছে। বিত্তবান লোকের সন্তান যাদেরকে আলালের ঘরের দুলাল বলা হয় তাদেরকে বেকারদের তালিকায় ফেলা ঠিক নয়। কারণ তারা কর্মক্ষম হওয়া সত্তেও কোন কাজ না করে বাপ দাদার সঞ্চিত সম্পত্তি ভোগ করে আলস্যে দিন কাটায়। এরূপ ইচ্ছাকৃত কর্মবিমুখদের ঠিক বেকার বলা না গেলেও, এরাও কিন্তু এ জাতির জন্য একটি অভিশাপ। বাংলাদেশের অনিচ্ছাকৃত বেকারদের সংখ্যা কত যে আশংকাজনকহারে বাড়ছে তা প্রতীয়মান হয় চাকরীর জন্য আবেদনকারীদের প্রতিযোগিতায়। ২০০৭ সালে এই ব্লগারের মালিকানাধীন একটি প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে 'অফিস সহকারী' পদে নিয়োগ দানের লক্ষ্যে দৈনিক শ্যামল সিলেটে ছোট্র একটি সার্কুলার দেওয়া হয়েছিল। আবেদনকারীর যোগ্যতা চাওয়া হয়েছিল এইচ.এস.সি পাশ। সেই একটি পদে আবেদন পড়েছিল সর্বমোট ৪৩টি যার মধ্যে অনার্স- মাষ্টার্স ডিগ্রীধারীরাও ছিলেন। ইন্টারভিউ বোর্ডে একজন আবেদনকারী এই ব্লগারকে বলেছিলেন, 'স্যার, চাকরীটা আমার হবে তো? আমার চাকরীটা খুবই দরকার স্যার। আমার বাবা নেই, মা অসুস্থ। পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ নেই। একটু দয়া করুন স্যার।' তার সেই আবেদনে এই ব্লগারের হৃদয়কে বুলেটবিদ্ধ করতে পারলেও তাকে চাকরী দেওয়া সম্ভব হয়নি। বাস্তব জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে বেকারত্ব একটি বড় ধরনের সামাজিক সমস্যা। অনেক আশা ভরসা নিয়ে ছেলে-মেয়েরা লেখা পড়া শেষ করে চাকরীর সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী চাকরী না হওয়ার ফলে তাদেরকে সমাজে অপমান আর অবহেলার শিকারই হতে হয় সবচেয়ে বেশি। কারো সাথে দেখা হলেই জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কী কর?’ এ জাতীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে অভ্যস্থ নয় বেকারেরা। কারণ আসলে তারা কী করে তা তারা নিজেরাই জানে না। সার্টিফিকেট ফাইলবন্দী করে, পে-অর্ডার আর ব্যাংক ড্রাফট করে এবং সার্টিফিকেট ফটোকপি করে রিক্সা ভাড়া দিয়ে এ সব বেকারের আয়ের উতস না থাকা সত্তেও ব্যয় নির্বাহ করতে হয় মাসে অন্তত ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। দেশ ও সমাজের উচ্চ পর্যায়ের কোন কর্তা ব্যক্তির সামনে এসব বেকার গিয়ে হাজির হলে কেউ ‘দূর হও’ বলে তাড়িয়ে দেন আর কেউ বড়জোর ‘আহারে’ বলে একটি নি:শ্বাস ফেলেন মাত্র। বেকার সমস্যা কীভাবে দূর করা যায়, সেই চিন্তা করার সময়টুকুও তাদের নেই।


এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বর্তমানে দেশের কর্মক্ষম জনশক্তির ৪০ শতাংশই বেকার। চাহিদা মতো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না বলেই বেকার যুবকের সংখ্যা বাড়ছে আশংকাজনকভাবে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা, কর্মক্ষম যুবশক্তি কোন নির্দিষ্ট কাজে জড়িত না থাকলে অপরাধ প্রবণতার দিকে ঝুকে পড়াটা তাদের জন্য অস্বাভাবিক নয়। আর এজন্যই সমাজে সন্ত্রাস, চাদাবাজি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ওয়াদার মধ্যে ছিল ক্ষমতায় গেলে প্রতিটি পরিবারের একজনের চাকরীর ব্যবস্থা করা হবে। বিষয়টি কতটুকু অবাস্তব তা এ ব্লগের পরিসংখ্যান থেকেই যে কোন সাধারণ লোকও বুঝতে পারবে।

বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশে এখন বেকারের সংখ্যা ৫ কোটির উপরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৫ সালে দেশে বেকারের হার বর্তমান থেকে দ্বিগুণ হবে। প্রতি বছর প্রায় ২৭ লাখ ছেলে-মেয়ে দেশ প্রথমবারের মতো চাকরীর বাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু এদের মধ্যে মাত্র ৭ লাখের কর্মসংস্থান হচ্ছে। আর এরা সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমলেও নতুন কাজের সুযোগ তৈরি না থাকায় বেকারত্ব বেড়ে চলেছে। ৯০ দশকে বেকারত্ব বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৯ শতাংশ। কিন্তু গত ১০ বছরে তা বেড়ে দাড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে। ব্যুরোর মতে, ২০০০ সালে দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪০ লাখ। সে সময় কর্মক্ষম নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ২ লাখ। মোট জনসংখ্যা ছিল ১৩ কোটি। জনগোষ্ঠির ৪০ শতাংশকেই বেকার বলে উল্লেখ করা হয়। সেই হিসেবে বর্তমানে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে সাড়ে ৬ কোটিই বেকার!

বেকারত্ব দূর করার জন্য উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের সম্প্রারণ, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্প বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা দরকার। সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত। শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে কর্মমূখী শিক্ষার দিকে ঝুকতে হবে। কম্পিউটার, তথ্য-প্রযুক্তি, কুটির শিল্প কিংবা কৃষি খাতে স্বল্প বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। বর্তমান সরকার বেকারত্ব নিরসনের প্রতিশ্রুতি দয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। তাদের সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রীয় খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। সম্ভাবনাময় যুবশক্তিকে ‘বোঝা’ হিসেবে নয় ‘সম্পদ’ হিসেবে বিবেচনা করে তাদেরকে কাজে লাগাতে হবে, কাজ দিতে হবে। অন্যথায় জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য।
 

বাংলাদেশে এমএলএম: সমস্যা ও সম্ভাবনা

undefined


বাংলাদেশে এমএলএমঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা-১

পূর্ব কথা
এই ব্যবসা পদ্ধতিটি সম্পর্কে বর্তমানে বাংলাদেশে নেতিবাচক ধারণা পোষণকারী মানুষের সংখ্যা হয়তো বেশি, কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে এই এম.এল.এম বা মাল্টিলেভেল মার্কেটিং ব্যবসাটি বর্তমানে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। কেউ এর মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছেন, কেউ অর্থ উপার্জনের আশায় টাকা খুইয়ে গালে হাত দিয়ে বসে আছেন আর কেউবা নেটওয়ার্কারের হাত থেকে বাঁচার জন্য পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। লেখার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিসহ রুচিশীল মন্তব্য প্রত্যাশা করছি।


পর্ব-১
জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ক্রমবর্ধমান চাপে বর্তমানে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে বেকারত্ব। সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রিধারী শিক্ষিত মেধাবী তরুণদের একটি অংশ পাড়ি জমাচ্ছে দেশের বাইরে, স্বদেশে তাদের চাহিদা মতো কর্মসংস্থান না পেয়ে। বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত হয়ে অনেকেই ঘুরে বেড়াচ্ছে সার্টিফিকেট হাতে চাকরীর সন্ধানে। যার ফলে এস.এস.সি বা এইচ.এস.সি পাশ করেই এখন দেশের সম্ভাবনাময় তারুণ্যের বড় একটি অংশ দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। দেশের বাইরে গেলেই যে সমস্যার সমাধান হয়ে যাচ্ছে তা নয় বরং এর ফলে সমস্যা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। যারা পেশাহীন অবস্থায় নেই, চাকরী কিংবা ছোটখাটো ব্যবসার সাথে জড়িত তাদেরও একটা বড় অংশ আয়ের তুলনায় ব্যয়ের প্রয়োজন বেশি থাকায় হাঁপিয়ে উঠতেছে দিন দিন। তাই তাদেরকেও খুঁজতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত আয়ের উৎস। আবার ব্যবসা করতে আগ্রহী অনেকেই পুঁজির অভাবে হতাশায় ভুগছেন। নেটওয়ার্ক মার্কেটিং ব্যবসা তাদের জন্য বাংলদেশে নিয়ে এসেছে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত।

বাংলাদেশে এমএলএম বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং এর কার্যক্রমঃ
উন্নত বিশ্ব যেখানে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গতিশীল, আমরা সেখানে এখনও সেকেলে ধ্যান-ধারণায় হাবুডুবু খাচ্ছি। ১৯৪০ সালে আবিস্কৃত মাল্টিলেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম ব্যবসা আমাদের দেশে ১৯৯৯ সালে এলেও জনসাধারণের কাছে তা এখনও সুপরিচিত নয়। এ দেশে নেটওয়ার্ক বা মাল্টিলেভেল মার্কেটিং যে একটি ব্যবসা, বিগত দশ বছরেও তা অনেকেরই বোধগম্য হয়নি। যারা এমএলএম কোম্পানি পরিচালনায় আছেন তাদের বিষয়টি আরো গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। জনসাধারণকে এ ব্যাপারে সচেতন করতে হবে। অনেকেই এমএলএম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা লাভ করেন মূলত দুর্বল নেটওয়ার্কারের কারণে। যথাযথ প্রশিক্ষণ গ্রহণ না করেই অনেক এমএলএম কর্মী ঘরে ঘরে দাওয়াত নিয়ে ছুটে যান স্বল্প সময়ে অধিক অর্থ উপার্জনের আশায়। এ ক্ষেত্রে জনগণের নিকট সঠিক ধারণাটি উপস্থাপন করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়না। আবার প্রচলিত কিছু এমএলএম কোম্পানি পণ্য ভিত্তিক না হওয়ায় জনগণ এটাকে ইন্সুরেন্স কোম্পানি ভেবে ভড়কে যান। বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন এমএলএম কোম্পানির কাজ হচ্ছে সদস্য বানানো, যা সম্পূর্ণ ভুল। কেউ কেউ ভুল তথ্য সরবরাহ করে এমএলএম বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিংকে হারাম ব্যবসা বলে ইসলাম প্রিয় জনতাকে বিশৃঙ্খল করতেও কার্পণ্য করেন না। নিজে এমএলএম এর জ্ঞান অর্জন না করেই এ সম্পর্কে কিছু বলা কতটুকু যক্তিসঙ্গত হতে পারে তা সংশ্লিষ্টদের বিবেকের কাছেই ছেড়ে দিচ্ছি।



বাংলাদেশে এমএলএমঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা-২

এমএলএম বা মাল্টিলেভেল মার্কেটিং সম্পর্কে ধারণাঃ 
মাল্টিলেভেল বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং ব্যবসা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি বৈধ, সৎ ও দ্রুত সম্প্রসারণশীল ব্যবসা। ১৯৪০-৪১ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘ক্যালিফোর্নিয়া ভিটামিন’ (নিউট্রিলাইট প্রোডাক্টস ইনকর্পোরেটেড) সর্ব প্রথম মাল্টিলেভেল মার্কেটিং পদ্ধতির মাধ্যমে তাদের পণ্য বিপণন শুরু করে, যার উদ্যোক্তা ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার একজন কেমিষ্ট ডঃ কার্ল রেইন বোর্গ । ১৯৫৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সংসদীয় বিলের মাধ্যমে মাত্র ১০ ভোট বেশি পেয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজের পাশাপাশি এমএলএম সিস্টেম সারা বিশ্বে মার্কেটিং করার স্বীকৃতি লাভ করে। এর পর থেকেই এর বিকাশ হচ্ছে দ্রুততর গতিতে।
এই ব্যবসাটি শুধুমাত্র বিভিন্ন দেশের আইন দ্বারাই স্বীকৃত নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের কারিকুলামেও এ বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত। মার্কিন য্ক্তুরাষ্ট্রের ইলিনয়িস বিশ্ববিদ্যালয়, শিকাগো এবং লং আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমএলএম’র উপর কোর্স রয়েছে। আমাদের দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ/এমবিএ কোর্সে ও এখন এ পদ্ধতিটি অন্তর্ভূক্ত।
বর্তমানে সারা বিশ্বে ১২৫টিরও বেশি দেশে ১২,০০০ (বারো হাজার) এর বেশি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি এই পদ্ধতিতে তাদের পণ্য এবং সেবা বিপণন করে আসছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এমএলএম ব্যবসা বর্তমানে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সেখানে অনেকগুলো কোম্পানি কাজ করছে। মালোয়েশিয়াতে ৮০০টিরও বেশি কোম্পানি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। বিশ্বের বহুল পরিচিত এমএলএম কোম্পানি হচ্ছে আমেরিকার ‘এমওয়ে কর্পোরেশন’।
এছাড়া আরো কয়েকটি উলে¬¬খযোগ্য কোম্পানি হচ্ছে- এভোন, নিউ ভিশন ইন্টারন্যাশনাল, মেলালুকা, হার্বালাইফ ইন্টারন্যাশনাল, উসানা, শ্যাকলী, প্রি-পেইড লিগ্যাল, লংজীবিটি নেটওয়ার্ক ইত্যাদি। বাংলাদেশে যে সমস্ত এমএলএম কোম্পানি তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে এগুলোর মধ্যে নিউওয়ে বাংলাদেশ (প্রাঃ) লিঃ, ডেসটিনি ২০০০ লিঃ, অথেনটিক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিঃ হেল্পলাইন ডিসট্রিবিউশন লিঃ, বিকল্প ফার্মা, তিয়ানশি, আপট্রেন্ড টু ইউ বাংলাদেশ লি:, পিনাকল, মডার্ণ হারবাল, ডিএক্সএন, ম্যাকনম ইন্টারন্যাশনাল লি:, স্বদেশ সোর্সিং লি:, স্বদেশ কর্পোরেশন লি:,  ভিশন প্লাস ইন্টারন্যাশনাল লি:, ড্রিম প্লাস, এনেক্স ওয়াল্ড ট্রেড লি:, মেন্টর ইন্টারন্যাশনাল লি:, মাতৃভূমি ইন্টারন্যাশনাল লি:, লাইফওয়ে, ভিনশন ইন্ডাস্ট্রিজ বাংলাদেশ লি:, জীবনধারা লিমিটেড, র‌্যাভনেক্স, ইজেন ইন্টারন্যাশনাল লি:, দি ব্যাঙ্গল ওয়ে প্রা. লি:, আর্থ ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লি:, সাকসেস গ্লোবাল কর্পোরেশন লি:, ড্রিম প্লান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লি:,   ইলিংকস, লাইফ কনসর্টোয়িাম (প্রা.) লি.; এপার্টমেন্ট মার্কেটিং লি.; অ্যাসুরেন্স (বিডি) লি.; এম্বিশন ড্রিম মার্কেটিং কো.; ব্রাভো আইটি ইন্টারন্যাশনাল লি.; চলনবিল ট্রেড এ্যান্ড কমার্স (প্রা.) লি.; এনকারেজ ট্রেডিং লি.; ফরএভার লিভিং প্রোডাক্টস বাংলাদেশ লি.; ফেইথ মার্কেটিং সিস্টেম লি.; ফোর স্কোয়ার এন্টারপ্রাইজ; গণ ই ওয়ার্ল্ড ওয়াইড লি.; জেওনেট লি.; গোল্ডেন ফিদার লি.; গৃহ নির্মাণ মার্কেটিং লি.; গনদর্মা মেইন স্টকিস্ট (বাংলাদেশ) লি.; গযাসিয়ার (বিডি) লি.; গ¬্যান্স গেইন কো. লি.; গৃহ-ই-মার্কেটিং লি.; গ্রিন একটিভ বিজনেস সিস্টেম লি.; গোয়ের্ডন নেটওয়ার্ক লি.; হারবা লাইফ আন্টারন্যাশনাল লি.; ইছামতি গোল্ডেন (বিডি) লি.; ইন্টারন্যাশনাল টং চেং প্রোডাক্টস (বিডি) লি.; জেফরি সোর্সিং লি.; কান্তাম বাংলাদেশ লি.; লয়েড ভিশন (প্রা.) লি.; লিবার্টি (বিডি) নেটওয়ার্ক মার্কেটিং (প্রা.) লি.; লাইফ টাইম কনসেপ্ট লি.; মাস্ক মার্কেটিং (প্রা.) লি.; মেগাপলিশ লি.; মাল্টি ফোকাস বিজনেস সিস্টেম লি.; মাল্টিভিশণ ২০১০ লি.; মাল্টি ভিশন আর্থ (প্রা.) লি.; ন্যাচারল হার্বস লি.; নাফ ইন্টারন্যাশনাল লি.; ওয়ান মিলিয়ন (প্রা.) লি.; ওশ্যান মার্কেটিং কো. লি.; প্যারামাউন্ট হেল্থ এ্যান্ড হার্বাল লি.; প্যানাসিয়া গোলাবাল নেটওয়ার্ক লি.; রেইনবো মাল্টি বিজনেস লি.; রয়্যাল ড্রিম ইন্টারন্যাশনাল লি.; রয়্যাল ড্রিম লি.; রয়্যাল ভিশন (প্রা.) লি.; রাইজিং বাংলাদেশ (প্রা.) লি.; স্যাঙ্গুইন (বিডি) প্রা. লি.; শেখ ব্রাদার্স শিপিং করপোরেশন লি.; এসএমএন গোলাবাল লি.; সুক সারি বাংলাদেশ লি.; স্বাবস ইন্টারন্যাশনাল লি.; সেলফ ড্রিম (প্রা.) লি; স্কেচ লি.; স্টান্ডার্ড বায়ো-নিউট্রিশন কো. (প্রা.) লি.; টোন এ্যান্ড টিউন নেটওয়ার্ক লি.; দ্য এইমস সলিউশন (প্রা.) লি.; দ্য ড্রিম ওয়ে টিম (প্রা.) লি.; মানসি (বাংলাদেশ) কো. লি.; ভিলেজ ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক কো. লি.; ভিশন (প্রা.) লি.; ওয়েফান্ড ফাউন্ডেশন লি:, বিজ-এইম কর্পোরেশন লি:, এমওয়ে ইন্টারন্যাশনাল লি:, নিওন বাংলাদেশ প্রা: লি:, ইউনিপে-টুইউ-বাংলাদেশ লি:, স্পিক এশিয়া অনলাইন (বিডি) লি:, টিভআই এক্সপ্রেস, লাক্সারী, লিজেন্ড ভেন্চার, ভিসারেব, ইউনিগোল্ডটু্‌  ইউ, গোল্ডেন ট্রেড, ইউনাইকো বাংলাদেশ লি: প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য।

এমএলএম পদ্ধতিতে কিভাবে পণ্য বিপণন করা হয়?
প্রচলিত পদ্ধতিতে একটি পণ্য উৎপাদিত হয়ে সরাসরি ক্রেতা বা ব্যবহারকারীর নিকট যেতে পারে না। একটি পণ্য উৎপাদন করতে যে খরচ হয় সেই খরচের সাথে লভ্যাংশ যোগ করে সংশি¬ষ্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি একসাথে একটি এজেন্সীর কাছে পণ্যগুলো সরবরাহ করে থাকে। এজেন্সী পণ্যগুলোকে তার সুবিধামতো পাইকারী বিক্রেতাদের কাছে একটা লভ্যাংশ যোগ করে বিক্রি করে দেয়। পাইকারি বিক্রেতারা উক্ত পণ্যসমূহ খুচরা বিক্রেতাদের নিকট নিজের লভ্যাংশ রেখে সরবরাহ করে। ভোক্তা বা ক্রেতা অর্থাৎ যিনি পণ্য ব্যবহারকারী তাঁকে উক্ত পণ্যটি খুচরা দোকানদারের নিকট থেকে ক্রয় করতে হচ্ছে। ধরা যাক আব্দুল হালিম নামে এক ভদ্রলোক ঢাকার বসুন্ধরা সিটির একটি কাপড়ের দোকান থেকে একটি সার্ট বা জামা ক্রয় করলেন ১০০০ টাকা দাম দিয়ে। বসুন্ধরা সিটির ওই দোকানী সার্টটিতে লাভ করলেন মাত্র ১০০ টাকা, অর্থাৎ এই সার্টটি তিনি কোন একটি পাইকারী বিক্রেতার কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন ৯০০ টাকার বিনিময়ে। ওই পাইকারি বিক্রেতা আবার সার্টটিতে ২০০টাকা লাভ করেছেন, অর্থাৎ এজেন্সী থেকে তিনি সার্টটি ক্রয় করেছেন ৭০০ টাকা দিয়ে। এজেন্সী সার্টটিতে ৩০০ টাকা লাভ করেছে অর্থাৎ সার্টটি উৎপাদনকারী তাঁর খরচ এবং লাভসহ এজেন্সীর কাছে বিক্রি করেছে মাত্র ৪০০ টাকা দিয়ে। উৎপাদনকারীর যদি এই সার্টে উৎপাদন খরচ ৩০০ টাকা হয় তাহলেও দেখা যাচ্ছে তিনি সার্টটিতে ১০০ টাকা লাভ করলেন। অথচ প্রকৃত ব্যবহারকারী যিনি অর্থাৎ ভোক্তা বা ক্রেতাকে সার্টটি ক্রয় করতে হলো ১০০০ টাকা দিয়ে। মাঝখানে কয়েকটি হাতবদলের সময় সার্টটির দাম আরো ৬০০ টাকা বেড়ে গেল। যদি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি সার্টগুলো ক্রেতা/ ব্যবহারকারীর নিকট ১০০০ টাকা দামে বিক্রি করতো তাহলে ১০০ টাকার জায়গায় লাভ করতে পারতো ৭০০ টাকা। মধ্যস্বত্তভোগী বলে পরিচিত এজেন্ট, পাইকারি বিক্রেতা এবং খুচরা বিক্রেতারা এখানে অংশ নিতে পারতোনা। সে ক্ষেত্রে উক্ত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ক্রেতা সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে যেত নতুবা তাকে আরো বিনিয়োগ করে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে হতো। কিন্তু উক্ত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যদি এমন কোন ঘোষণা দেয়, যে এখান থেকে একটি সার্ট যিনি ক্রয় করবেন, তাঁর রেফারেন্সে আরো ক্রেতা আসলে আমি যে মুনাফা অর্জন করবো, তাঁর একটি অংশ রেফারেন্সকারী ক্রেতাকে দেয়া হবে। তাহলেই উক্ত প্রতিষ্ঠানটি ডাইরেক্ট মার্কেটিং কোম্পানি বলে গণ্য হবে। আর এই ডাইরেক্ট মার্কেটিং কোম্পানি মূলতঃ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয় বলেই একে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং কোম্পানি বলা হয়। বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় বলে, বিভিন্ন কোম্পানি বিভিন্ন নামে পরিচিতি লাভ করে। ক্রেতা সদস্যদের মধ্যে লভ্যাংশ বন্টনের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ কোম্পানি একটি লেভেল পরিমাপ করার কারণেই এ জাতীয় কোম্পানিগুলোকে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম কোম্পানি বলা হয়। নিচের ছকের মাধ্যমে প্রচলিত পদ্ধতির সাথে ডাইরেক্ট মার্কেটিং পদ্ধতির পার্থক্য তুলে ধরা হলোঃ

প্রচলিত পদ্ধতিঃ
পণ্য উৎপাদনকারী/ আমদানীকারক--> এজেন্সী--> পাইকাবিক্রেতা--> খুচরা বিক্রেতা--> ক্রেতা/ ভোক্তা
ডাইরেক্ট মার্কেটিং পদ্ধতিঃ
পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান/ আমদানীকারক--> সরাসরি ক্রেতা/ ভোক্তা।
প্রচলিত পদ্ধতিতে পণ্য বিপণনের জন্য প্রচুর টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রয়োজন থাকলেও এমএলএম পদ্ধতিতে কোন বিজ্ঞাপনেরই প্রয়োজন হয় না।


বাংলাদেশে এমএলএমঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা-৩

(পূর্ব প্রকাশের পর)
এমএলএম সম্পর্কে চরম সত্য অথচ কিছু ভ্রান্ত ধারনা
undefined

পূর্ব কথা
এই ব্যবসা পদ্ধতিটি সম্পর্কে বর্তমানে বাংলাদেশে নেতিবাচক ধারণা পোষণকারী মানুষের সংখ্যা হয়তো বেশি, কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে এই এম.এল.এম বা মাল্টিলেভেল মার্কেটিং ব্যবসাটি বর্তমানে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। কেউ এর মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছেন, কেউ অর্থ উপার্জনের আশায় টাকা খুইয়ে গালে হাত দিয়ে বসে আছেন আর কেউবা নেটওয়ার্কারের হাত থেকে বাঁচার জন্য পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। লেখার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিসহ রুচিশীল মন্তব্য প্রত্যাশা করছি।

পর্ব-১
পর্ব-২
আমি যদি বলি এমএলএম বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং ব্যবসার প্রধান কাজ হচ্ছে ‘পণ্য বিপণন করা’ তাহলে যারা বাংলাদেশে এই ব্যবসার সাথে পরিচিত তাদের অনেকেই দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। কেবল যারা এ জাতীয় ব্যবসার সাথে জড়িত তাদের একটি অংশ আমাকে সাপোর্ট করতে পারেন। কারণ এটাই প্রকৃত সত্য। কিন্তু এই প্রকৃত সত্য কথাটির আড়ালে আমাদের দেশে যেটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে সেটা হল, এমএলএম বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং ব্যবসার প্রধান কাজ হচ্ছে ‘সদস্য সংগ্রহ’। কেউ কেউ আরেকটু আগ বাড়িয়ে বলতে পারেন ‘মানুষ ঢুকানো’। আবার যারা এই ব্যবসার সাথে মোটামুটিভাবে জড়িত তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ বলতে পারেন ‘ডান হাত ও বাম হাত পূরণ করাই’ হচ্ছে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং এর কাজ।

কেবল এতটুকু ধারনা নিয়েই যদি সকলে বসে থাকতেন, তাহলেও নিদেনপক্ষে সহজে কেউ এ ব্যবসাটির বিরোধীতা করতে পারতেন না। কিন্তু সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে বর্তমানে এই এমএলএম ব্যবসাটি এমন নেতিবাচকভাবে মিশে গেছে যে, কেউ কাউকে এ সম্পর্কে কিছু বলতে গেলেও তাকে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। যদিও বিভিন্ন এমএলএম কোম্পানি তাদের মার্কেটিং ডিস্ট্রিবিউটরদের ট্রেনিং দিয়ে বিভিন্ন কলাকৌশল শিখিয়ে দিয়েছে এবং অনেকেই তা রপ্ত করতে পেরেছেন তবুও এসব এখন আর কোন কাজেই লাগছে না। এমন কি কেউ যদি তার পরিচিত কাউকে ফোন করে বলেন, ‘আপনার সাথে আমার একটা জরুরি বিষয়ে আলাপ আছে’, তবে ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তিটি এমএলএম এর দাওয়াত ভেবে আতংকিত হয়ে যান অনেক ক্ষেত্রে। আর কেউ যদি আরেকটু স্পষ্ট করে বলে দেন, ‘আমি একটি কোম্পানিতে আছি’ কিংবা ‘আমার অফিসে একবার বেড়াতে আসুন’ , তাহলে শ্রবণকারী ব্যক্তিটির আর বুঝতে বিলম্ব হয় না যে, তিনি এই মাত্র একটি এমএলএম কোম্পানির বিজনেস কনসেপ্টের সাথে পরিচিত হতে যাচ্ছেন। বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে অধিকাংশ শিক্ষিত সচেতন ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের এবং শিক্ষার্থী ও বেকারদেরও অনেকেরই এসব ক্ষেত্রে ‘ছেড়ে দেয় মা, কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন কিছু কোম্পানি বা আন্তর্জাতিক সংস্থা এ দেশের মানুষকে টাকা দিয়ে টাকা বানানোর এক নতুন খেলায় আগ্রহী করে তুলতে সক্ষম হয়েছে অত্যন্ত সুকৌশলে। এর ফলে দেশের মানুষেরর মধ্যে এমএলএম সম্পর্কে যে ভুল ধারনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা আরো জটিল আকার ধারন করছে। 


বাংলাদেশে এমএলএমঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা-৪

undefined

‘প্রসঙ্গঃ নেটওয়ার্ক মার্কেটিং ব্যবসা’ শিরোনামে বিগত ২০১০ সালের শেষ দিকে এই ব্লগে একটি সিরিজ লেখা শুরু করে মাত্র তিনটি পর্ব লিখেই দীর্ঘ বিরতি দিয়েছিলাম। তৃতীয় পর্ব পড়ার পর অনেকেই সিরিজটি চালিয়ে যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু নানা ব্যস্ততায় এ বিষয়ে আর লিখতে বসা হয়নি।
তৃতীয় পর্ব...

কেন এই নেতিবাচক ধারনা?
মাল্টিলেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম ব্যবসার প্রতি মানুষের নেতিবাচক ধারনা একদিনে তৈরি হয়নি। এদেশের মানুষ একসময় এই পদ্ধতি সম্পর্কে কিছুই জানতো না। আর সেই না জানার সুযোগে একটি বিদেশী কোম্পানি ১৯৯৯ সালে মানুষের হাত থেকে প্রচুর টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়েই এ দেশে এমএলএম ব্যবসার আবির্ভাব ঘটে। প্রকৃত ঘটনা কী ঘটেছিল তা ভোক্তভোগীদের মধ্যকার সচেতন কিছু মানুষ ছাড়া বাকীদের ক্ষেত্রে ‘প্রচুর টাকা হাতিয়ে নেওয়া’ ছাড়া কোম্পানিটির আর কোন কার্যক্রম সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই তেমন কিছু জানতে পারেনি। মানুষ যখন মাথায় হাত দিয়ে ‘হায় হায়’ করতে শুরু করে তখন পত্র-পত্রিকায়ও প্রকাশিত হতে শুরু করে বিভিন্ন সংবাদ। অবশ্য এই ঘটনার আগেও ‘হায় হায় কোম্পানি’ উপাধিটি একাধিক কোম্পানির ভাগ্যে জুটেছিল তবে তা এমএলএম কোম্পানি নয়।

যাই হোক সংশ্লিষ্ট বিদেশী কোম্পানিটি শেষ পর্যন্ত উধাও হয়ে যায়। বাস্তবে তারা ভিন্ন নামে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। কোম্পানিটি ছিল শ্রীলংকান বংশদ্ভূত একজন কানাডিয়ান নাগরিকের মালিকানাধীন। তিনি প্রথমবার বাংলাদেশে ব্যবসা করতে এসে ধাক্কা খেয়ে নতুন পথ বেছে নিতে দেরী করেননি। তবে আরো কিছুদূর এগোতে না এগোতেই তাঁর এদেশীয় বন্ধু মহল আরেকবার তাঁকে ধাক্কা দিয়ে বসেন। তারপর চলে আসে নতুন শতাব্দী।

২০০০ সালের শেষ দিকে (ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ) আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশী মালিকানাধীন এমএলএম কোম্পানি ‘ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড’।
তার পর থেকেই মূলতঃ এমএলএম ব্যবসা ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। বিদেশী মালিকানাধীন ‘নিউওয়ে’ আর দেশীয় মালিকানাধীন ‘ডেসটিনি’ তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছিল অনেকটা সমান তালেই। এরা মানুষকে যেমন এমএলএম এর শিক্ষা দিয়েছে তেমনই নেতিবাচক ধারনারও জন্ম দিয়েছে।

‘নিউয়ে বাংলাদেশ প্রাঃ লিঃ’ দীর্ঘ এক দশক ধরে মানুষের কাছ থেকে কৌশলে নগদ অর্থ সংগ্রহ করেছে, বিনিময়ে দিয়েছে সাইকেল ভিত্তিক কমিশন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘পণ্যের উপস্থিতি’ থেকে গেছে কেবল কাগজে কলমে। তারা যে প্রক্রিয়ায় ব্যবসা করেছে তা ১০০% সঠিক হলেও তাদের অনেক গ্রাহকই সেটাকে বুঝতে পারে নি।

অন্যদিকে ‘ডেসটিনি’ নিউওয়েকে অনুসরণ করতে গিয়ে আরেক ধাপ এগিয়ে যায়। তারা পণ্যই বিক্রি করে তবে সঙ্গে যুক্ত করে বড় অংকের ‘চার্জ বা জয়েনিং ফি’।
তাদের এ প্রক্রিয়াটি এক সময় ফ্লপ মারে। তাই বুদ্ধি খাটিয়ে ‘বনায়ন’ কর্মসূচি নিয়ে আসে। সাময়িকভাবে কিছুটা ইতিবাচক দৃষ্টি ভঙ্গি তৈরি করতে সক্ষম হলেও তাদের এই কাজটি মূলতঃ নগদ অর্থ সংগ্রহ করারই নামান্তর।

বাংলাদেশে এ দু’টি কোম্পানির গ্রাহকই সবচেয়ে বেশি বলে জানা যায়। দু’টি কোম্পানির তুলনামূলক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উভয় কোম্পানি মানুষের কাছে এমএলএম এর বার্তা পৌঁছাতে পারলেও অধিকাংশ নেতিবাচক ধারনার জন্ম তাদের মাধ্যমেই হয়েছে। এর কিছু যুক্তিসঙ্গত কারণও রয়েছে। নিম্নে তা উল্লেখিত হলো-
১. নিউওয়ে এবং ডেসটিনি দু’টি কোম্পানিই বাইনারি ও মেট্রিক্স পদ্ধতির ‘বিজনেস প্লান’ ভিত্তিক হওয়ায় মানুষের মধ্যে ‘ডান হাত-বাম হাত’ পূরণের আতংক তৈরি হয়!

২. কোম্পানিগুলোর কোন নিজস্ব পণ্য না থাকায় তাদের সরবরাহকৃত বিভিন্ন পণ্য মূল্য বাজার মূল্যের অধিক হওয়ায় সাধারণ মানুষ এসব পণ্য ক্রয় থেকে বিরত থাকে।

৩. উল্লেখিত ২টি কোম্পানিসহ অন্যান্য কোম্পানিরও পণ্য তালিকায় মানুষের প্রয়োজনীয়/ নিত্য ব্যবহার্য পণ্য বরাবরই অনুপস্থিত থাকে।

৪. নিজের পেশাকে ঠিক রেখে পার্ট-টাইম কাজ করার অফার দিলেও কোম্পানিগুলো মানুষকে অস্বাভাবিক আয়ের অবাস্তব স্বপ্ন দেখাতে থাকে।

৫. ‘এমএলএম কোম্পানিতে জয়েন করার বা সদস্য হওয়ার একমাত্র পথই হলো সংশ্লিষ্ট কোম্পানি থেকে একটি পণ্য ক্রয় করা নিজের ব্যবহারের জন্য’ এই ধারনা বদলে গিয়ে ‘কোম্পানির সদস্য হতে হলে কিছু টাকা দিতে হয়’ এই ধারনাটি মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়।

৬. ‘প্রত্যেক সদস্যের কাজ কোম্পানির পণ্য বিপণন কার্যক্রমে অংশ নেয়া’ ধারনাটি বদলে গিয়ে মানুষের মধ্যে এই ধারনার জন্ম হয় যে, ‘কোম্পানির সদস্যদের কাজই হচ্ছে নতুন সদস্য তৈরি করা’।

৭. অধিকাংশ সদস্যই বিজনেস প্লান ভাল করে না বুঝে (অনেকে বুঝার পরও) নিজের আয় বাড়ানোর জন্য নতুন মানুষকে চাপাচাপি করে কিংবা বিভিন্ন লোভনীয় বিভ্রান্তিমূলক অফার দেওয়ায় মানুষ জয়েন করার পরে এসব কথার মিল না পেয়ে পুরো এমএলএম ব্যবস্থাকেই প্রতারণামূলক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতারক মনে করে।

এরকম আরো অনেক কারণেই মানুষের মধ্যে এমএলএম এর ব্যাপারে ‘নেতিবাচক ধারনা’ তৈরি হয়।সাম্প্রতিক সময়ে ‘ইউনিপেটুইউ’ এবং এ জাতীয় আরো কিছু কোম্পানি মানুষকে এই ব্যবসার বিষয়ে নেতিবাচক ধারনা তৈরির চূড়ান্ত প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে।



বাংলাদেশে এমএলএমঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা-৫

আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই এমএলএম ব্যবসা পদ্ধতিটা ভাল করে বুঝতে না পারার কারণে এই ব্যবসার ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। প্রচলিত দু’একটি কোম্পানির বিজনেস প্লানের সাথে আংশিক বা পুরোপুরি পরিচিত হয়ে পুরো এমএলএম পদ্ধতিকে ভাল বা মন্দ বলা কোন অবস্থাতেই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। আমাদের দেশের অনেক মানুষেরই এমএলএম এর ব্যাপারে ভুল ধারনা রয়েছে। যেমন-
১। ‘এমএলএম’ কোম্পানিকে অনেকেই ব্যাংক, বীমা কিংবা কো-অপারেটিভ সোসাইটিসহ বিভিন্ন ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানের মতো মনে করেন।
আসলে এমএলএম কোম্পানি মোটেও সেরকম বা সে জাতীয় কোন প্রতিষ্ঠান নয়।
২।
নিউওয়ে, ডেসটিনিসহ বিভিন্ন কোম্পানির বাইনারি প্লান দেখে অনেকেরই এই ধারনা তৈরি হয়ে যায় যে, এমএলএম কোম্পানির কাজই হচ্ছে ডানে একজন বামে একজন মানুষ ঢুকানো।
প্রকৃতপক্ষে অনেকগুলো পদ্ধতির মধ্যে এটি মাত্র একটি পদ্ধতি। বিভিন্ন এমএলএম কোম্পানির বিভিন্ন রকম বিজনেস প্লান রয়েছে।
৩।
ডান-বাম ব্যালেন্স না হলে ইনকাম পাওয়া যায় না, যার ফলে অনেক ডিস্ট্রিবউটর ক্ষতিগ্রস্থ হয় আর কোম্পানি লাভবান হয়।
আসলে ব্যালেন্স বাইনারি লেভেল (বিবিএল) ভিত্তিক কোম্পানিগুলোর ডিস্ট্রিবউটররাই বেশি লাভবান হয়, কোম্পানি লাভ করে খুবই কম। কেননা এই পদ্ধতিতে লভ্যাংশ বা কমিশন বন্টন করতে হয় অনেক বেশি মানুষের মধ্যে আজীবন।
৪।
অনেকের ধারনা কোম্পানিতে জয়েন করতে হলে টাকা বিনিয়োগ করতে হয়।
আসলে এমএলএম কোম্পানি কখনোই টাকা বিনিয়োগ করায় না এবং বিনিয়োগের কোন সিস্টেমও নেই।
৫।
অনেকেই মনে করেন, এমএলএম ব্যবসা হচ্ছে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার ব্যবসা।
আসলে এই ব্যবসা পদ্ধতিতে কোন অবস্থাতেই কারো পক্ষে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার সুযোগ নেই।
৬।
অনেকেই মনে করেন এমএলএম কোম্পানিতে জয়েন করার পর থেকেই আয় শুরু হয়ে যায় বা শুরু হওয়ার কথা।
আসলে এমএলএম ব্যবসায় জয়েন করার পর কমপক্ষে ৬ মাস কোন আয় শুরু হওয়ার কথা নয় এবং নিয়মিত ভাল আয় করার জন্য কমপক্ষে ২ বছর নেটে কাজ করতে হয়।
৭।
অনেকেই মনে করেন এই ব্যবসা পদ্ধতিতে বিনা পরিশ্রমে ও বিনা পুঁজিতে ইনকাম করা যায়।
আসলে এটাও একটা ভুল ধারনা। কারণ এমএলএম ব্যবসা পরিশ্রম ও পুঁজি দুটোরই প্রয়োজন হয়।

এমএলএম ব্যবসার বিভিন্ন পদ্ধতিঃ
বিভিন্ন এমএলএম কোম্পানি বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যবসা পরিচালনা করে। এসব ব্যবসা পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে গেলে অনেক সময় লাগবে। বিশেষত: এসব পদ্ধতির সাথে গাণিতিক এমন কিছু থিওরি জড়িত রয়েছে যা কেবল কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদানের মাধ্যমেই বুঝানোর দাবি রাখে। জানি আমার কথার সাথে অনেকেই একমত হতে পারবেন না কারণ তারা ‘এমএলএম’কে খুবই হালকা কোন বিষয় ভেবে থাকেন। বাস্তবে এমএলএম ব্যবসা পদ্ধতি কেবল পড়াশোনা করেও পুরোপুরি জানা সম্ভব নয় যদি না কেউ প্র্যাকটিকেলি ব্যবসাতে না আসেন। আর এখানেও সমস্যা তৈরি হয়। কেননা যেখানে বাংলাদেশের অধিকাংশ এমএলএম কর্মীই নিজের কোম্পানির ব্যবসা পদ্ধতিটাই ভাল করে আয়ত্ব করতে পারেন না সেখানে অন্যান্য কোম্পানির বিজনেস কমপেনসেশন প্লান বুঝবেন কি করে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় এক কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটর আরেক কোম্পানিকে পাত্তাই দিতে চান না। যার ফলে বছরের পর বছর পার হলেও তাদের এমএলএম ব্যবসায় হাতে খড়ি হয় না। আর সময়ে অসময়ে তাদের কোম্পানি কর্তৃপক্ষ নিজেদের ইচ্ছেমতো বিজনেস প্লান পরিবর্তন করলেও তারা এর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে পারেন না! আর যারা এমএলএম ব্যবসায় জড়িত হন অন্যের প্ররোচনায় এবং এটা যে একটি ব্যবসা সেটাই বুঝতে চান না তারা তো ‌‌'হায় হায়' ছাড়া আর কিছুই বুঝতে পারেন না।

যাই হোক মূল আলোচনায় আসি। এমএলএম ব্যবসার অনেকগুলো পদ্ধতি থাকলেও সংক্ষেপে সর্ব সাধারণের বুবিধার্তে এটাকে দু-ভাগে ভাগ করা যায়। এক. সরাসরি স্পন্সর বা রেফারেন্স এবং দুই. টিম ওয়ার্ক বা গ্রুপ ইনকাম। কোন কোন কোম্পানি কেবল গ্রুপ ইনকাম ভিত্তিক হলেও বিশ্বের অধিকাংশ এমএলএম কোম্পানিতেই সরাসরি স্পন্সর এবং গ্রুপ ইনকাম উভয় পদ্ধতির প্রচলন রয়েছে। নিম্নে এ দু'টি পদ্ধতির সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা প্রদান করা হলোঃ

এক. সরাসরি স্পন্সর বা রেফারেন্সঃ
এই কাজটি আমরা প্রায় সময় করে থাকি। ধরা যাক আমি একটি কম্পিউটার ক্রয় করলাম একটি দোকান থেকে তারপর আমার কোন বন্ধুকে উক্ত দোকানে রেফারেন্স করলাম। বন্ধুটি হয়তো আমার কাছে জানতে চেয়েছিল, কোন্ দোকান থেকে কম্পিউটার কিনলে ভাল হয়? আমাদের পরিচিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আমরা এভাবে প্রতিনিয়ত বহু কাস্টমারকে রেফার করি। বিনিময়ে আমরা কিছু পাই না এবং পাওয়ার আশাও করি না। কোন কোন ক্ষেত্রে কেউ কেউ ‌'কমিশন' গ্রহন করলেও সেটার কোন সামাজিক
মর্যাদা থাকে না। বরং 'কমিশন' গ্রহনকারী ব্যক্তিকে 'দালাল' বলে চিহ্নিত করা হয়।
এমএলএম কোম্পানি এই ‌পদ্ধতিকে ব্যবসারই একটি অংশ মনে করে। এখানে একজন ক্রেতার রেফারেন্সে আরেকজন ক্রেতা আসলে রেফারারকে একটি কমিশন বা বোনাস প্রদান করা হয়। আমার মতে যারা এই কাজকে 'দালালি' মনে করে সংকোচ বোধ করেন তাদের এই ব্যবসায় না আসাটাই ভাল। একটি ব্যবসা পদ্ধতিতে যে সবাইকেই কাজ করতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা তো নেই। এসব ব্যক্তির অনেকের জন্য বরং লন্ডনের 'ডিসি' হওয়াটাই সম্মানজনক। (ডিসি= ডিশ ক্লিনার!)

তবে এই ডাইরেক্ট রেফারেল ইনকাম কিন্তু স্থায়ী ইনকাম নয় বরং ওয়ান টাইম ইনকাম। আপনি কোন ক্রেতার কাছে কোম্পানির কোন পণ্য বিক্রি করতে পারলে তবেই তার কমিশন পাবেন।


দুই. টিম ওয়ার্ক বা গ্রুপ ইনকামঃ
এটাই হচ্ছে এমএলএম কোম্পানির আকর্ষণীয় ইনকাম বন্টন ব্যবস্থা। পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় ধনী দিনে দিনে আরো ধনী হতে থাকে আর গরীব কেবল গরীবই হয়। মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানি তার ক্রেতা-পরিবেশকদের সমান হারে কমিশন বন্টন করে থাকে ফলে এখানে সকলেরই ধনী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এই পদ্ধতিটাকে একটা 'গ্রুপ বিজনেস' হিসেবে অভিহিত করাটাই যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করছি।

একজন ক্রেতা এমএলএম কোম্পানি থেকে পণ্য ক্রয় করে কোম্পানির সদস্য হওয়ার পর থেকে 'বিক্রয় প্রতিনিধি' বা সেলস রিপ্রেজেনটিটিভ হিসেবে বিবেচিত হন। তিনি তখন এক বা একাধিক সেলস টিম গঠনের সুযোগ পান। কোম্পানি ভেদে এই সেলস টিমটির আকৃতি ভিন্ন রকম হয়। বাইনারি প্রক্রিয়ায় একজন ক্রেতা-সদস্যকে দুজন ক্রেতা বৃদ্ধি করতে হয়। তার পর দু'য়ের জ্যামিতিক বৃদ্ধির হার অনুযায়ী এটা ২ থেকে ৪, ৮, ১৬, ৩২, ৬৪, ১২৮, ২৫৬, ৫১২, ১০২৪ এইভাবে বাড়তে থাকে। আবার ট্রাইনারি প্লানে প্রথমে ১ থেকে ৩ হয়ে তারপর ৩ থেকে ৯, ২৭, ৮১, ২৪৩, ৭২৯, ২১৮৭ এইভাবে দ্রুত টিম বড় হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক ক্রেতা-সদস্যকে মাত্র ৩ জন ক্রেতা সদস্য বৃদ্ধি করতে হয় বা ৩টি পণ্য বিক্রি করতে হয়। এভাবে কোন কোন কোম্পানি ৫ এর জ্যামিতিক হারে কিংবা ৭ এর জ্যামিতিক হারে তাদের সেলস টিম এর গঠন কাঠামো তৈরি করে।

সেলস্ টিমের আকৃতি অনুযায়ী ডাউনলাইনের প্রত্যেক সদস্য তাদের প্রত্যেকের আপলাইন সদস্যের সেলস এসিস্ট্যান্ট হিসেবে গণ্য হন। আর প্রত্যেকের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতে কোম্পানি যে প্রফিট করে তারই একটি নির্দিষ্ট অংশ উক্ত সদস্যদের মধ্যে সমান হারে বন্টন করে থাকে। লভ্যাংশ বা কমিশন বন্টনের হারটি পরিমাপ করা হয় সেলস এর একটি সুনির্দিস্ট পরিমাণ থেকে যা কোম্পানি ভেদে সাইকেল, রাউন্ড, সিরিজ, বোর্ড, লেভেল, স্টেপ, সেট, পেয়ার প্রভৃতি নামে পরিচিত।

এছাড়াও নির্দিষ্ট সেলস টার্গেট পূরণের উপর ইনসেনটিভ বা রিওয়ার্ড প্রদানেরও ব্যবস্থা থাকে।

একটি ওয়েবসাইটে বিস্তারিত বেশ সুন্দরভাবে বিভিন্ন এমএলএম পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে ভাষাগত পরিবতন তৈরি হতে পারে তাই সরাসরি ইংরেজিতেই দিয়ে দিলাম।
Binary Plan
A Binary Plan is like a 2xInfinity Forced Matrix with a Twist. In a Binary you would have 2 Legs. You would typically earn a commission on the Entire Volume of your weakest Leg. Many binary's have systems in place that may allow you to earn Commissions at a later (via a Carryforward) on your Strongest leg.

Matrix Plan
This plan allows you to build a limited width organization. For example, a 2 X 12 group means two people on your first level, and paying 12 levels deep. Other examples would be a 4 X 5, 3 X 9, etc. This is generally pretty simple and easy to understand and explain. The low volume requirements usually common to matrix plans helps make it a good plan for part-time distributors.

Australian Binary Plan / Tri-Binary
Tri- Binary Or Australian Binary Plan Looks Very Similar. Only Difference Between During The Payout For Pair Matching Required In Tri-Binary, Where As No Matching Required In Australian Binary.

Forced Matrix Plan
A Forced Matrix Is Similar To A Unilevel Matrix But It Limits The Amount Of People Each Person Can Have In Their First Level. A Very Popular Kind Of Forced Matrix Is A 3x9,5x5,5x7 Forced Matrix Etc.

Step Plan
This is a simple, straightforward compensation plan. It allows for a distributor to have a first level of unlimited width. The levels the company pays commission on generally range from 3 to 9 levels deep. The more volume generated by you and your organization, the more you can earn. A disadvantage to this plan is that building wide means the distributor may give less help to his personal enrollees.

Board Plan
variety of board split logics as per client chosen logic to meet their 100% customization or choice along with most advance features
• Cross Matrix
• Re-cycle entry
• Unlimited Income
• Automatic move to next level

Unilevel Plan
Unilevel Plan Is A Simple And Easy To Understand Plan. In The Beginning, Distributors Like Them Because They Can Get Paid Commissions Quickly. However, They May Become Discouraged When Their Organization Starts To Grow Bigger Especially At The Deeper Levels Where They Could Not Get Any Overriding Commissions. This May Cause The Heavy-Hitters To Move To Another Company That Pays More Aggressively To The Heavy-Hitters.

Generation Plan
This is the most common of all the compensation plans. It is where most of the really big money is made in MLM. This big money, however, is made by a very small percentage of people. Breakaway plans are geared for full-time effort. Attrition is the highest with breakaway plans and it generally will cost more to build your business. This is a work program. It takes persistence, salesmanship, and requires the ability for you to train your recruits. Companies which use breakaway plans tend to pay higher commissions. However, the plan may be extremely difficult for most people to duplicate.

Stairstep Plan
The Stairstep Plan Is The Compensation Plan That Pays You For The Total Volume Of Your Group. The Total Volume Of Your Group Can Be Achieved By Your Own Personal Sales Volume Or Your Downlines’ Sales Volume.

Breakaways Plan
Breakaways Are Used With Matrix Pay Plans. When A Team Member Reaches Certain Qualification They Break Away From Your Team And You No Longer Receive The Matrix Pay Out On That Team Member Or Anyone In That Part Of The Matrix (The Break Away). You Do However Receive A Lump Sum Monthly Commission Of The Entire Volume Of The Break Away Unit.




বাংলাদেশে এমএলএমঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা-৬

এমএলএম ব্যবসায় কি পুঁজি বিনিয়োগের প্রয়োজন আছে?
undefined 
এমএলএম-কে আমাদের দেশে অনেকেই 'পুঁজি ছাড়া রুজি' বলে অভিহিত করে থাকেন। আবার অনেকেই তাদের পণ্য মূল্যকেই ব্যবসার পুঁজি মনে করেন। সাধারণতঃ কোন কোম্পানি থেকে এক বা একাধিক পণ্যের প্যাকেজ ক্রয় করার কারণে কোম্পানি তাঁকে ‌'ক্রেতা সদস্য তথা পরিবেশক' হিসেবে ব্যবসা করার সুযোগ দিয়ে থাকে। তিনি এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণই ‌স্বাধীন। ইচ্ছা করলে ব্যবসা করতে পারেন, আবার ইচ্ছা করলে ব্যবসা নাও করতে পারেন। তাহলে তিনি কোম্পানি থেকে যে পণ্য বা পণ্যের প্যাকেজ ক্রয় করলেন সেই পণ্য বাবদ কোম্পানিকে যে ‌'টাকা' প্রদান করলেন তা কি করে তার ব্যবসার পুঁজি হতে পারে। অবশ্য অনেক কোম্পানি ‌'বিজনেস সেন্টার' এর রেজিস্ট্রেশন ফি গ্রহণ করে থাকে। সে ক্ষেত্রে ওই রেজিস্ট্রেশন ফি-ও সদস্যের ব্যবসার পুঁজি হতে পারে না। তবে এরকম অনেক কোম্পানি রয়েছে যারা প্রথম অবস্থাতেই ‌'স্টকিষ্ট' নিয়োগ দিয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি ব্যবসা করতে চাইলে প্রথমেই উক্ত কোম্পানির বেশ কিছু পণ্য নিজে ক্রয় করে নিজ খরচে তা বিক্রয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তাকে আলাদা দোকান ঘর বা শোরুম দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই তার এই বিনিয়োগ-কে 'পুঁজি' বলা যায়। কিন্তু যারা কোন কোম্পানি থেকে একটি মাত্র পণ্য বা পণ্যের প্যাকেজ নিজের ব্যবহারের জন্য ক্রয় করে ‌'ডিস্ট্রিবিউটর' হিসেবে কাজ শুরু করেন তাদের সেই পণ্য ক্রয় বাবদ প্রদত্ত টাকা কোন অবস্থাতেই ব্যবসার 'পুঁজি' হতে পারে না। কারণ তিনি ব্যবসা করবেন কি না সেটাই তো তখনও ঠিক হয়নি। আমাদের দেশে কিছু ডিস্ট্রিবিউটর নিজেদের ইনকাম দ্রুত বাড়ানোর জন্য নিজেরা জেনে বুঝেই হোক আর না জেনে বুঝেই হোক মানুষকে অপরিকল্পিতভাবে ভুল-ভাল বুঝিয়ে এমএলএম ব্যবসায় সম্পৃক্ত করে থাকেন। ফলে যা হবার তাই হয়। মানুষের মনে ‌এমএলএম এর ব্যাপারে কেবল নেতিবাচক ধারণাটাই তৈরি হয়।

প্রতিটি ব্যবসা কাজই শুরু করার আগে ভাল করে ভেবে-চিন্তে ও যাচাই করে শুরু করা উচিত, এমএলএম এর ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। ভাবনা-চিন্তা করে যদি কারো মনে হয় তিনি এই ব্যবসা করতে পারবেন তাহলেই কেবল তার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এমএলএম কোম্পানিগুলোর সফটওয়্যার এর এক একটি বিজনেস সেন্টার বা ট্রেডিং একাউন্ট এক একজন বিজনেস পার্সনের জন্য এক একটি দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। প্রচলিত ব্যবসায় একটি মার্কেটের কোন একটি দোকান ঘরের পজিশন যদি কাউকে দেওয়া হয় তাহলে যেমন সেখানে পুঁজি বিনিয়োগ করে ব্যবসা শুরু করতে হয় তেমনি এমএলএম কোম্পানির 'বিজনেস সেন্টার' বা 'ট্রেডিং একাউন্ট' এর ক্ষেত্রেও পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয় । কিন্তু আমরা সেটা না করে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার আশায় মানুষের পেছনে দৌড়াতে থাকি বলেই একসময় মুখ থুবড়ে পড়ি আর 'তওবা' করি জীবনে কখনোই এমএলএম এর সাথে জড়িত হব না। আবার কিছু কিছু এমএলএম কোম্পানিও এই সুযোগে তাদের স্বার্থ হাসিল করে গুটিয়ে যায়। অনেক কোম্পানি আবার নিজেরাই মুখ থুবড়ে পড়ে পরিকল্পনাহীন পথ চলার ফলে।

কিছু কিছু এমএলএম কর্মী তাদের বিজনেস সেন্টারকে ডেকোরেশন না করে নিজেদের দেহকেই ডেকোরেশনের আওতায় নিয়ে আসনে। আমাদের দেশের 'ডেসটিনি' এ ক্ষেত্রে এক বড় দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। অফিস টাইম ছাড়া কারো গলায় 'টাই' ঝুলতে দেখলে অনেকেই তাকে 'ডেসটিনি'র লিডার ভেবে ভড়কে যান। মার্কেটিং এর জন্য নিজেকে স্মার্ট বানানো জরুরি কিন্তু তারও আগে জরুরি আপনি কি মার্কেটিং করবেন তা নির্ধারণ করা। কোম্পানি আপনাকে যে পণ্যটি মার্কেটিং করতে বলবে সেটা মানুষ যেচে এসে কিনতে চাইবে না এটাই স্বাভাবিক। মার্কেটিং ডিস্ট্রিবিউটরদের কাজই হচ্ছে বাজারে পণ্যটির চাহিদা তৈরি করা। কিন্তু আমরা এমএলএম কোম্পানিতে জয়েন করি ভিন্ন উদ্দেশ্যে। ‌'পণ্য' শব্দটিকে 'পুঁজি' করেই এখানে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেনে হয়ে যায়। যার ফলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। আমার এক বন্ধু একটি এম্এলএম কোম্পানিতে কাজ করে প্রায় 'কোটি' টাকা ইনকাম করে বর্তমানে অবসর জীবনে চলে গেছেন কিন্তু শর্ত মোতাবেক এখন আর তার 'রয়েলিটি' ইনকাম আসছে না। কারণ তার টিমর এক লক্ষা আশি হাজার 'ডিস্ট্রিবিউটর' এখন আর কোন কাজ করছেন না। বরং অনেকেককেই মাথায় হাত দিয়ে 'হায় হায়' করতে দেখা যায়। খোজ নিয়ে জানা গেল এই প্রায় দুই লাখ 'ডিস্ট্রিবিউটর' কাগজে-কলমে পণ্য ক্রয় করার জন্য কোম্পানিতে টাকা জমা দিয়েছিলেন কিন্তু তাদের অনেকেই জানতেন না যে ওই টাকা তারা পণ্য ক্রয় করার জন্য দিচ্ছেন। কোম্পানি তাদেরকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় পণ্য সংগ্রহরে জন্য আহবান জানালেও তাদের অনেকেই মনে করেন এই কোম্পানি পালিয়ে গেছে। কারণ তারা কোম্পানিতে জয়েন করার সময় তাদেরকে নাকি বলা হয়েছিল প্রতি সপ্তাহে তারা ইনকাম পাবেন! আসলে ব্যবসা পদ্ধতি ভাল করে বুঝতে না পারার কারণেই এমনটি হয়েছে। ইদানিং 'ই-কমার্স' ভিত্তিক কিছু কোম্পানি অবশ্য এই প্রক্রিয়াটিকে অনেকটাই সহজ করে দিচ্ছে। তবে বাংলাদেশের কত জন মানুষই বা কম্পিউটার ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন! ফলে এই প্রক্রিয়াটি ধীরগতিতে আগাচ্ছে। পরর্তীতে 'ই-কমার্স বেইজড এমএলএম' নিয়ে একটি পর্ব লেখার ইচ্ছা রইল। আজকের পর্বে 'এমএলএম ব্যবসার প্রাথমিক পুঁজি' নিয়ে লেখার কথা ছিল কিন্তু এর ভূমিকা লিখতে গিয়েই একটি পর্ব শেষ করে দিলাম।



বাংলাদেশে এমএলএমঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা-৭

undefined
বাংলাদেশে ১৯৯৯ সাল থেকে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং বা মাল্টিলেভেল মার্কেটিং ব্যবসা শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত এমএলএম’র উপর বেশ কিছু বই-পুস্তকও রচিত হয়েছে বাংলা ভাষায়। বিদেশি কিছু বইয়ের অনুবাদও এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। কয়েকটি এমএলএম কোম্পানির মাধ্যমে বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার অংশ হিসেবে বিভিন্ন রকমের ট্রেনিংয়েরও ব্যবস্থা রয়েছে। প্রায় অর্ধ কোটি মানুষ বর্তমানে এ ব্যবসার সাথে জড়িত হওয়ার ফলে ক্রমেই এই ব্যবসাটি বিস্তৃত হচ্ছে সারা দেশে। সবচেয়ে বড় কথা, এ দেশে অনেক মানুষেরই আয় রোজগার করার একটা সহজ ব্যবস্থা করে দিয়েছে এই এমএলএম। কিন্তু সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে অনেকেই ব্যবসাটিতে সফল হতে পারছেন না। মূলতঃ সঠিকভাবে ‘পুঁজি’ বিনিয়োগ না করার কারণেই এমনটা হয়।

প্রতিটি ব্যবসায় পুঁজি বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে অনেকেই মনে করেন বা বলে থাকেন এম.এল.এম বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং ব্যবসায় কোন পুঁজি খাটাতে হয় না। স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে এটাই সত্য, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কোন এম.এল.এম কোম্পানিতে ব্যবসা কেন্দ্র বা বিজনেস সেন্টার প্রাপ্তির নামই যদি ব্যবসা হতো তাহলে বিগত এক দশকে যারা এ ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন তারা প্রত্যেকেই কোটিপতি হয়ে যেতেন। অর্থাৎ অনেকেই মনে করেন ব্যবসা শুরু করার জন্য যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয় সেটাই তার বিনিয়োগ। আর এভাবে চিন্তা করলে অধিকাংশ এম.এল.এম কোম্পানিতে ব্যবসা শুরু করার জন্য কোন টাকা দিতে হয় না। প্রায় সকল কোম্পানিতেই পণ্য ক্রয় করলে বিজনেস সেন্টার ফ্রি দেওয়া হয়। দেখা গেছে সাধারণ মানুষ পণ্য ক্রয় করতে যে টাকা খরচ হয় (ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ৩২০০ টাকা দিয়ে একটি ডিনার সেট বা মোবাইল সেট ক্রয় করলেন ) সেটাকেই তাদের ইনভেস্ট বা বিনিয়োগ মনে করেন। আর এরই সূত্র ধরে তারা পরবর্তীতে কতদিনের মধ্যে এই বিনিয়োগটি ফেরৎ নিতে পারবেন, সেই প্রচেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ এ ক্ষেত্রে সফলকাম হলেও তাদের সেই তথাকথিত মূলধন (যে টাকার পণ্য আগেই ক্রয় করে নিয়ে গেছেন ) উদ্ধার হওয়ার পর বা আরো কিছু মুনাফা নিয়ে যাওয়ার পর তাদের বিজনেস সেন্টারটি অফ হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহে স্বয়ংক্রিয়ভাবে (অটোমেটিক) মুনাফা না পাওয়ার বিষয়টি ভাল করে বুঝার পরে তাদের অধিকাংশই হতাশ হয়ে ব্যবসা থেকে সরে যান। আর কেউ কেউ নতুন করে ব্যবসা শুরু করেন। আর যারা ব্যবসা সম্পর্কে ভালভাবে অবগত না হয়ে জয়েন করেন তারা মনে করেন এটা একটি প্রতারণামূলক ব্যবসা। এখান থেকে জীবনে লাভবান হওয়া সম্ভব নয়। তাই তারা প্রাথমিক ভাবে এম.এল.এম ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত হলেও পরবর্তীতে এম.এল.এম ব্যবসার ঘোর বিরোধী হয়ে উঠেন। সারা জীবন নিজে এ ব্যবসা না করার সিদ্ধান্ত নেন এবং অন্যদেরও এ ব্যবসা পদ্ধতির সাথে সম্পৃক্ত হতে বাধা দেন। তারা নিজেরা সুন্দর ও সম্মানজনক আয় থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি যারা এ পেশায় নিয়োজিত হন তাদেরকেও আয় বঞ্চিত রাখেন পরোক্ষভাবে। মূলতঃ এম.এল.এম বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং এর প্রাথমিক পুঁজি বিনিয়োগ না করার ফলেই এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

প্রাথমিক পুঁজি বলতে আমরা কি বুঝি?
কোন একটা ব্যবসা শুরু করার জন্য ঐ ব্যবসার উপযোগী পরিমাণ ‘প্রাথমিক পুঁজি’ বিনিয়োগ করার প্রয়োজন হয়। যেমন- পঁচিশ-ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে পান-সিগারেটের দোকান শুরু করা যায়। আবার পাড়ার মোড়ে একটি মুদি দোকান দিতে গেলে লক্ষাধিক টাকার প্রয়োজন হয়। কমপক্ষে দশ-পনেরো লক্ষ টাকা প্রাথমিক ভাবে বিনিয়োগ না করে একটি ঔষধের দোকান (ফার্মেসী) বা ভাল মানের একটি কাপড়ের দোকানও খোলা যায় না। আর বড় ধরনের কোন শপিং মল বা মাল্টি ন্যাশনাল কোন কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটরশীপ নিতে গেলে চল্লিশ-পঞ্চাশ লক্ষ টাকার দরকার হয়। মূলতঃ একটি ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রাথমিক ভাবে এরকম যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয় সেটাই হচ্ছে ‘প্রাথমিক পুঁজি’।
সাধারণ যে কোন ব্যবসাতেই আপনার এমন পরিমাণ লাভ করতে হয় যাতে পুঁজিটুকু বহাল থাকে। লাভ কম হলে বা ব্যবসায় লোকসান হলে ব্যবসা পরিচালনার জন্য পুঁজিতেই হাত দিতে হয়। ফলে এক সময় পুঁজি ফুরিয়ে যায় এবং ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। আর যদি ব্যবসার শুরুতে প্রাথমিক পুঁজিটাই না থাকে কিংবা যে ব্যবসায় যে পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করা দরকার তারচেয়ে কম বিনিয়োগ করা হয় তাহলে ব্যবসার অবস্থাটা কেমন দাঁড়াবে, ভেবে দেখুন। এক্ষেত্রে আপনার ব্যবসায় উন্নতির কোন আশাই থাকবে না এবং খুব অল্পদিনের মধ্যে পুঁজি ফুরিয়ে যাবে এবং ব্যবসাটি বন্ধ হয়ে যাবে। সাধারণ যে কোন ব্যবসায় প্রাথমিক পুঁজি ফুরিয়ে গেলে কিংবা পরিমাণ মতো প্রাথমিক পুঁজি না থাকায় আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যেমনি বন্ধ হয়ে যাবে, তেমনি এম.এল.এম বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং ব্যবসাতেও শুধুমাত্র প্রাথমিক পুঁজি না থাকায় কিংবা তা যথাযথভাবে বিনিয়োগ না করায় আপনার বিজনেস সেন্টারের ইনকাম বন্ধ হয়ে যাবে।

এম.এল.এম ব্যবসার প্রাথমিক পুঁজিএম.এল.এম বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার সময় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আপনার কোন অর্থ বিনিয়োগ করার প্রয়োজন পড়ে না। সাধারণত মাত্র কয়েক হাজার টাকার পণ্য ক্রয় করেই আপনি একটি কোম্পানির সদস্য বা ডিস্ট্রিবিউটরশীপ পাবেন। তবে আপনি যদি শুধু মাত্র পণ্য ক্রয় করার জন্য কোন কোম্পানিতে যান তাহলে আপনার কাছে একটি পণ্য বিক্রয় করার বিনিময়ে কোম্পানি আপনাকে একটি বিজনেস সেন্টার বা ডিস্ট্রিবিউটরশীপ দিলেও আপনি সেখান থেকে ভাল ইনকাম করতে পারবেন না। আপনার ব্যবসা শুরু করার জন্য আপনাকে অবশ্যই ‘প্রাথমিক পুঁজি’ বিনিয়োগ করতে হবে। এম.এল.এম বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ে যারা সফল ব্যবসায়ী হতে চান, তাদেরকে মূলতঃ কয়েকটি বিশেষ গুণাবলী অর্জন করতে হয় যা এখানে আপনার ‘প্রাথমিক পুঁজি’ হিসেবে গণ্য হবে। আপনার এম.এল.এম ক্যারিয়ারটিকে সুন্দর করে সাজাতে হলে এই গুণাবলীগুলো অবশ্যই অর্জন করতে হবে। এখানে তা ব্যাখ্যা সহ আলোচনা করা হলো।
(বিঃদ্রঃ এই অংশে লেখার ধরন কিছুটা ‘গাইড লাইন’ টাইপের হয়ে গেছে। কষ্ট করে প্রত্যেকে নিজের মতো পড়ে নেবেন।)

১) এম.এল.এম সংক্রান্ত জ্ঞানঃ
ক. নেটওয়ার্ক মার্কেটিং বা এম.এল.এম সম্পর্কে মৌলিক বা সাধারণ জ্ঞান আপনাকে অর্জন করতে হবে।
খ. আপনি যে কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করবেন সেই কোম্পানি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হবে।
গ. কোম্পানির পণ্য এবং পয়েন্ট ভ্যালু সম্পর্কে জানতে হবে।
ঘ. কিভাবে ডিস্ট্রিবিউটরশীপ অর্জন করা যায় এবং ইনকাম করা যায় এ সম্পর্কে ভাল ধারণা অর্জন করতে হবে।
ঙ. কোম্পানির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে হবে।
চ. কোম্পানির বিজনেস প্লানটি ভাল করে বুঝতে হবে এবং অপরকে বুঝানোর যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

২) উন্নত চরিত্রঃ
ক. সমাজের ভাল মানুষ হতে হবে।
খ. আপনার উপর মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস থাকতে হবে।
গ. লোভ পরিহার করতে হবে।
ঘ. মানুষকে দেয়া ওয়াদা বা মানুষের আমানত যথাযথভাবে রক্ষা করতে হবে।
ঙ. অন্যের কল্যাণকামী হতে হবে।

৩) ধৈর্য্যঃক. প্রথম কয়েক মাস আপনার কোন ইনকাম নাও আসতে পারে। কিংবা অল্প অল্প ইনকাম আসবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিদিন আপনার পকেট থেকে অনেক টাকা খরচ হবে এটাই স্বাভাবিক। ঠিক এই জায়গায় অনেকেই ঠিকে থাকতে পারেন না। ধৈর্য্য হারা হয়ে ফিরে যান। এমএলএম ব্যবসায় সফলতা লাভের জন্য তাই ‘ধৈর্য্য ধারণের কোন বিকল্প নেই।

৪) ইতিবাচক মানসিকতাঃ আপনি যে কাজে জড়িত হয়েছেন, সেটার উপর আপনাকে সন্তুষ্ট হতে হবে। আমাদের দেশে এই সেক্টরে যারা কাজ করেন তাদের অনেকেই অন্যের কাছে নিজের পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করেন। সমাজে প্রচলিত খারাপ ধারণার কারণেই এমনটা হয়। আপনি যদি এটাকে একটি ‘ব্যবসা’ মনে করে থাকেন তাহলে আপনার ব্যবসার উপর পূর্ণ আস্থা থাকতে হবে। কে কি বলল তা ভেবে সংকোচ করলে চলবে না।

সাফল্য অর্জনের আকাঙ্খাঃ আপনার ভিতরে যদি সাফল্য অর্জনের কোন আকাঙ্খা তৈরি না হয় তাহলে এখানে সাময়িক সফলতা আসলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। আপনাকে প্রথম সপ্তাহেই ঠিক করে নিতে হবে আপনি কতদিনের মধ্যে কোন্ অবস্থায় পৌছাতে চান। লক্ষ্যমাত্রা ঠিক না করে শুধু এমএলএম কেন, কোন সেক্টরেই সফল হওয়া যায় না।

৬) আত্মবিশ্বাসঃ আপনি যে কোম্পানিতে কাজ করছেন তাকে বিশ্বাস করেন কি না? আপনার উত্তর যদি ১০০% ‘হ্যাঁ’ না হয় তাহলে ধরে নিতে হবে কিছুদিনের মধ্যেই আপনার ব্যবসা লাটে উঠবে। আপনি যে পণ্য বিপণন করছেন তা নিজে ব্যবহার করে দেখেছেন কি? এর উত্তর অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ হতে হবে। পণ্যের গুণগত মান যদি আপনার নিকট গ্রহণযোগ্য না হয় তাহলে আপনি কি করে মানুষের কাছে বিপণন করতে যাবেন?

৭) পরিকল্পিত সময় দানঃ নেটওয়ার্ক মার্কেটিং ব্যবসায় ঘরে বসে দ্রুত বড়লোক হওয়ার কোন যাদু মন্ত্র নেই। এই ব্যবসায় সফলতা অর্জনের জন্য আপনাকে অবশ্যই পরিকল্পিতভাবে সময় দিতে হবে। অধিকাংশ মানুষই এটাকে ‘পার্ট-টাইম’ ব্যবসা হিসেবে নিয়ে থাকেন। সফলতা অর্জনের জন্য আপনাকে অবশ্যই ‘ফুলটাইম’ সময় দানের মানসিকতা অর্জন করতে হবে। এর মানে এই নয় যে কোন কোম্পানিতে জয়েন করার পরদিন থেকে অন্যান্য কাজ বাদ দিয়ে এখানে লেগে থাকতে হবে। প্রতিদিন অবশ্যই ২ থেকে ৩ ঘন্টা সময় এই ব্যবসার জন্য বরাদ্ধ রাখা দরকার। একান্তই যদি সেটা করা সম্ভব না হয় তাহলে সপ্তাহে অন্তত ২ দিন সময় দিতে হবে।

৮) প্রশিক্ষণ গ্রহণঃ ব্যবসায় সফলতা পেতে হলে আপনাকে অবশ্যই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। এই জন্য নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি আপনার কোম্পানির ট্রেনিং প্রোগ্রামে অংশ গ্রহণ করুন। যেহেতু এ দেশে এখনও সরকারি বা বেসরকারি ভাবে কোন প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়নি তাই প্রয়োজনে আপনার কোম্পানির পাশাপাশি অন্যান্য কোম্পানি থেকেও ট্রেনিং গ্রহণ করতে পারেন। মনে রাখতে হবে শেখার কোন শেষ নেই।

৯) নেটওয়ার্কার তৈরিঃ আপনি যদি কেবল পণ্য বিক্রি করেই যান আর আপনার কোন সহযোগী তৈরি করতে না পারেন, তাহলে এই ব্যবসায় বেশিদূর আগানো যাবে না। তাই পণ্য বিপণনের পাশাপাশি আপনার সেলস এসিস্ট্যান্ট তৈরি করুন।

১০) নিয়মিত টিম মিটিং করুনঃ আপনার সেলস টিমের সহযোগীদের নিয়ে নিয়মিত (প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একদিন) টিম মিটিং করুন। সকলের মধ্যে কাজ ভাগ করে দিন। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেখবেন অল্প দিনের মধ্যেই আপনি একজন সফল ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছেন। আপনার সেলস টিমের সবাইকে সফল করে তুলতে প্রচেষ্টা চালান। টিমের কেউ সফলতা দেখালে প্রাণ খুলে প্রশংসা করুন এবং সম্ভব হলে মাঝে মধ্যে পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা রাখুন।

১১) অর্থ বিনিয়োগঃ যদিও প্রচলিত ব্যবসার মতো এমএলএম ব্যবসায় এককালীন বড় অংকের পুঁজি বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় না তবুও আপনি সফল ব্যবসায়ী হতে হলে অবশ্যই আপনাকে বিনিয়োগ করতে হবে। কোম্পানির সবগুলো পণ্যই কম বেশি আপনাকে ব্যবহার করতে হবে এর গুণগত মান যাচাই করার জন্য। সেই সাথে আপনার কাজের সুবিধার্তে বেশ কিছু পণ্য মজুদ করে রাখুন। যাতে গ্রাহক পাওয়া মাত্র তার সামনে পণ্যটি উপস্থাপন করতে হয়। আমাদের দেশের অধিকাংশ এমএলএম কোম্পানিরই কোন শো-রুম নেই। এটা একটা সমস্যা। তাই সমস্যা কাটানোর জন্য প্রয়োজনে আপনি নিজেই একটি শো-রুম গড়ে তুলুন। মনে রাখবেন দৃশ্যমান পণ্য এবং পণ্যের গুণগত মানই আপনার ক্রেতাকে আপনার কাছে নিয়ে আসবে। আপনাকে অযথা মানুষের পিছনে ঘুরতে হবে না।
***উপরোক্ত সবগুলোই এমএলএম ব্যবসায় ‘ক্রেতা-সদস্য তথা পরিবেশক বা ডিস্ট্রিবি্উটরদের প্রাথমিক পুঁজি’।

*** কোম্পানি প্রতিষ্ঠাতাদের জন্য অবশ্যই এসব বিষয় মাথায় রেখে বিনিয়োগ করতে হবে। এছাড়াও যে সমস্ত বিষয় মাথায় রেখে উদ্যোক্তাদের পুঁজি বিনিয়োগ করতে হবে, তা হলো-


১) পণ্য উৎপাদনঃ এমএলএম কোম্পানির মূল কাজ যেহেতু পণ্য বাজারজাতকরণ তাই উদ্যোক্তাদের সর্ব প্রথম নিজস্ব ব্রাণ্ডের পণ্য উৎপাদন করা জরুরি। প্রথম দিকে এসব পণ্য ট্রেডিশনালি মার্কেটে ছাড়তে হবে এবং কিছু বিজ্ঞাপনও দিতে হবে। বাজারে কিছুটা চাহিদা তৈরি হলে এবং ব্যাপক পরিচিতি ঘটলে তখন মাল্টিলেভেল ভিত্তিক পণ্য বিপণনের উদ্যোগ নিতে হবে। মালোয়েশিয়া এমনকি ইন্ডিয়াতেও এবং বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশে এরকম হচ্ছে।

২) দেশব্যাপী শো-রুম বনাম অফিসঃ এমএলএম কোম্পানিগুলো সাধারণত নেট অফিস দিয়ে থাকে যেখানে মানুষ কেবল চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে থাকে আর লোকজনকে জয়েন করায়। এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা জরুরি। কোটি কোটি টাকা অফিসের ডেকোরেশনে খরচ না করে সীমিত পরিসরে হলেও অন্তত প্রতিটি জেলা শহরে কোম্পানির নিজস্ব খরচে শো-রুম থাকা প্রতিষ্ঠা করা দরকার। উপজেলা পর্যায়ে এজেন্সী শো-রুম দেওয়া যেতে পারে। শো-রুমের পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার জন্য অফিসের ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

৩) শক্তিশালী সফ্টোয়্যারঃ যেহেতু এই ব্যবসা পদ্ধতিতে ক্রেতা-পরিবেশকদের একটি লিংক-এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় তাই উক্ত লিংক ব্যবস্থাপনার জন্য শক্তিশালী সফ্টোয়্যার দরকার। বিশ্বে এ পর্যন্ত যত এমএলএম কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়েছে তার অধিকাংশই সফ্টোয়্যার জনিত সমস্যার কারণে। হাজার থেকে লক্ষ কোটি অতিক্রম করে হাজার হাজার কোটি গ্রাহক হয়ে যাওয়ার পর একবার যদি সফ্টোয়্যারটি ক্রাশ করে তাহলে তা পূণরায় সেটআপ দেওয়াটা অসম্ভব ব্যাপার। তাই ঝুঁকিমুক্ত অনলাইনভিত্তিক পূর্ণ নিরাপদ সফ্টোয়্যার তৈরি করুন।

৪) ডিস্ট্রিবি্উটরদের প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসাঃ ব্যবসাকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য ডিস্ট্রিবিউটরদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। (চলবে)





বাংলাদেশে এমএলএম: সমস্যা ও সম্ভাবনা-৮
ই-কমার্স এবং এমএলএম
undefined

(১ম পর্ব থেকে ৭ম পর্ব একসাথে পড়তে চাইলে এখানে ক্লিক করুন)...
ই-কমার্স এবং এমএলএম
আমরা পিছিয়ে রয়েছি এটাই সত্য তার চেয়েও বড় সত্য হচ্ছে আমাদের জানার আগ্রহটা খুবই কম। ইদানিং অনেককেই ই-কমার্স সম্পর্কে ভাল করে না জেনেই বিভিন্ন মন্তব্য করতে দেখা যায়। শুনতে খারাপ লাগলেও এই চরম বাস্তবতাকে আমাদের মেনে নিতেই হবে। দু'টি বাস্তব উদাহরণ দিয়েই আজকের পর্বটি শুরু করছি।

মাস কয়েক আগে (যখন সারা বাংলাদেশে ইউনিপেটুইউ, ভিসারেভ, স্পিক এশিয়া অনলাইন প্রভৃতি কোম্পানির জমজমাট অবস্থা) আমার পূর্ব পরিচিত এক ব্যক্তির সাথে এমএলএম নিয়ে কথা ওঠে। তিনি তখন ইউনিপের একজন বড় লিডার। আমাকে বুঝাতে চাইলেন যে, ইউনিপেটুইউ-ই বাংলাদেশের প্রথম সারির এমএলএম কোম্পানি। আমি বললাম, বেশিদিন এভাবে ঠিকবে না। আর তারা তো কোন এমএলএম কোম্পানিই নয় কারণ তারা কোন পণ্য বিপণন করতে এ দেশে আসেনি! তিনি আমাকে বললেন হ্যাঁ তারা এমএলএম নয়, তবে তারা 'ই-কমার্স মেথড' নিয়ে এসেছে আর তাই তারাই এদেশে নেতৃত্ব দিয়ে যাবে। আমি তাকে বললাম, ই-কমার্স সম্পর্কে আপনি কি জানেন, মানে ই-কমার্স জিনিসটা কি? তিনি আমতা আমতা করে বললেন, ই-কমার্স মানে হচ্ছে এই ই-কমার্স আর কি!

আরেকদিন আমার একটা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে একটি ব্যাংকের টিএনটি নাম্বারে ফোন করে বললাম, আপনার ব্যাংকের সুইফট কোডটা কত? তিনি আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, কেন সুইফট কোড দিয়ে আপনি কি করবেন? আমি অবাক হয়ে বললাম, আপনি জানেন না, সুইফট কোড দিয়ে লোকে কি করে? তিনি বললেন, আপনার কেন দরকার তাই বলেন। আমি বল্লাম, অনলাইনে ডলার ট্রান্সফার করবো। তিনি হেসে বললেন, এসব বোগাস এমএলএম কোম্পানির ডলার নিয়ে ঘরেই পড়ে থাকেন। ভাঙানেরা স্বপ্ন দেখে লাভ নেই। প্রকৃতপক্ষে আমি কোন এমএলএম কোম্পানির ডলার ভাঙানোর জন্য তাকে ফোন করিনি। পরে অবশ্য ওই ব্যাংকের ম্যানেজার আমাকে স্যরি বলেছিলেন তার অফিসারের আচরণে এবং নিজের ভিজিটিং কার্ডটা আমাকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। কার্ডের মধ্যেই ব্যাংকের সুইফট কোডটি লেখা ছিল!

এই হলো আমাদের কপাল পোড়া জাতির অবস্থা। এমএলএম বলতেই যেমন অধিকাংশ মানুষ 'ডেসটিনি' বা এই জাতীয় কোম্পানি মনে করছেন, তেমনি ই-কমার্স বলতেই অনেকে ইউনিপে বা অবৈধ মানিগেম মনে করছেন। প্রকৃতপক্ষে এই বিষয়টি কি তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময়টুকু হুজুগে বাঙালির কোন দিনই হয়নি।

ই-কমার্স আসলে কি?
ই-কমার্স শব্দের বাংলা প্রতিশব্দটি হবে 'ই-বাণিজ্য'।
ই- এর মানে হলো ইলেকট্রনিক, তাই 'ই-কমার্স' এর সরাসরি অর্থ দাঁড়ায় 'ইলেকট্রনিক বাণিজ্য' ।
ব্যবসা বাণিজ্য আমরা যুগ যুগ ধরে করে এসেছি ঠিকই কিন্ত আমরা সেখানে কোন ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করতে পারিনি। উন্নত বিশ্বে যেখানে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে সব ধরনের কেনাকাটা করছে সেখানে আমরা এখনও ঠিকমতো ডেবিট কার্ডের ব্যবহারটাও শিখতে পারিনি। ই-মেইলের বাংলা যেমন ই-চিঠি হলেও আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও ইমেইল আদান-প্রদানে অভ্যস্ত হতে পারেননি সেরকম ই-বাণিজ্যেও তারা আগামী কয়েক বছর পিছিয়ে থাকবেন বলেই মনে হচ্ছে। একমাত্র 'মোবাইল ফোন' আর 'টেলিভিশন' এর ব্যবহার ছাড়া আমরা অন্যান্য প্রযুক্তির ব্যবহারে অস্বাভাবিক হারে পিছিয়ে যাচ্ছি। আমার জানামতে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ কোন 'ই-কমার্স' চালু হয়নি। অনেকে চাইলেও সেটা শুরু করতে পারছেন না কারণ টাকার লেনদেনটা করার কোন রাস্তা এখনও এদেশে তৈরি হয়নি। 'পেপাল, এলার্টপে, মাস্টার কার্ড, ভিসা কার্ড' প্রভৃতি এখনও সোনার হরিণের পর্যায়ে রয়েছে বাংলাদেশে। আর এ সুযোগে ইউনিপে'র মতো অনেক কোম্পানি মানুষকে ভুল-ভাল বুঝিয়ে লুটে নিচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা।

সব কথার সারমর্ম এটাই, ই-কমার্স হচ্ছে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের একটি আধুনিক মা্ধ্যম। এটা পণ্য বিপণনের প্রচলিত পদ্ধতিও হতে পারে আবার এমএলএম পদ্ধতিও হতে পারে।

ই-কমার্স ভিত্তিক এমএলএম
এমএলএম এর ধ্যান-ধারণাটাই মূলতঃ আধুনিক। আর তাই এমএলএম কোম্পানিগুলো ই-কমার্সকে খুব সহজেই কাজে লাগাতে পারছে। আমাদের দেশের কতিপয় এমএলএম কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটররা যখন ঘরে ঘরে কোম্পানির ফরম নিয়ে দৌড়াচ্ছেন সাইনাপ করানোর জন্য আর মানুষকে তাদের পণ্য ও ব্যবসা পদ্ধতি বুঝানোর জন্য প্রচুর টাকা খরচ করছেন এবং এরপরও কোন কোন ক্ষেত্রে কোম্পানির ব্যর্থতার দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছেন সেখানে ই-কমার্স ভিত্তিক এমএলএম সহজেই ক্রেতা খুঁজে নিচ্ছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে। আর এসব কোম্পানিতে জড়িত হচ্ছেন শিক্ষিত, সচেতন মানুষ, যার ফলে কারো প্রতারিত হবার কোন সম্ভাবনাই নেই।

যেহেতু এমএলএম কোম্পানির মূল কাজই হচ্ছে পণ্য বিপণন আর ই- কমার্সের কাজও তাই, সেহেতু এমএলএম কোম্পানি সহজেই ই-কমার্স ভিত্তিক হতে পারে। মূলতঃ এখানে দু'টি পদ্ধতি পরস্পর পররস্পরের সহযোগী। আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে এমএলএম ও ই-কমার্স একে অপরের পরিপূরক। তবে আমাদের দেশে যেটা সমস্যা তা হলো মানুষ একটি কোম্পানির কার্যক্রমে ত্রুটি দেখতে পেলে এই জাতীয় সব কোম্পানিকেই ত্রুটিযুক্ত মনে করে। তাই ই-কমার্স এখনও এ দেশে চালু না হওয়ায় এবং কতিপয় এমএলএম কোম্পানি ই-কমার্সের মেথড ব্যবহার করায় সাময়িকভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে কিছুটা বিভ্রান্তি ছড়াতেই পারে।

মূলধারার এমএলএম ব্যবসার বাইরে ইন্টারনেট ভিত্তিক আরো কিছু কোম্পানির কার্যক্রমও দ্রুত গতিতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব কোম্পানির বেশিরভাগই বিজ্ঞাপন ভিত্তিক। অনেক অনলাইন সার্ভে কোম্পানিও রেফারেল পদ্ধতি চালু করেছে। তাছাড়া 'ইমেইল মার্কেটিং' নামে এখন আরেকটি ব্যবসা পদ্ধতির প্রচলন হয়েছে। এটাও মূলতঃ এমএলএম এরই নতুন সংস্করণ। এমএলএম পদ্ধতিতে যেহেতু পণ্য এবং সেবা বিপণন করা যায় তাই এসব অনলাইন প্রতিষ্ঠানগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বস্তুগত পণ্যের পরিবর্তে সেবা বিপণন করে থাকে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই ইংরেজি এবং কম্পিউটার ব্যবহারে পারদর্শী নয়, তাই সম্ভাবনাময় এসব অনলাইন ব্যবসার পরিবর্তে তারা অফলাইন ব্যবসার প্রতি এখনও অধিক মনোযোগী। তবে আশার কথা দিন যতই এগিয়ে যা্চেছ, আমাদের তরুণ প্রজন্ম ততোই তথ্য-প্রযু্ক্তির ছোঁয়ায় বদলাতে শুরু করেছে। ২০১৫- ২০২৫ এর দশকে হয়তো এ দেশে ই-কমার্সের জয় জয়কার শুরু হয়ে যাবে। ই-কমার্স বা অনলাইন ভিত্তিক এসব সেবা পেতে আমাদের দেশের আরেকটি বড় বাধা হলো কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগের দুষ্প্রাপ্যতা। প্রথম দিকে মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রেও এমনটি ছিল। তখন মোবাইলের দাম ছিল প্রায় ২০ হাজার টাকা আর ২১ দিনের প্রিপেইড কার্ড বা টকটাইম এর মূল্য ছিল ৩০০ টাকা। যে কারণে ওই সময়কালে অনেকের পক্ষেই ইচ্ছা থাকা সত্তেও মোবাইল ফোন ব্যবহার করা সম্ভব ছিল না। আর এখন, এক থেকে দেড় হাজারে মোবাইল ফোন বিক্রি হচ্ছে এবং টক টাইমও হাতের নাগালে চলে এসেছে। সরকার ইন্টারনেট ব্যবহারের ফ্রি সুবিধা দিতে পারলে তাদের সেই কাঙ্খিত 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' গড়ার কাজ অনেকটাই এগিয়ে যেত। (চলবে)