'মুক্তিযুদ্ধ' বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক শব্দ এবং এ শব্দের মূল বিষয় বস্তুটি দেশবাসীসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও মীমাংসিত। অথচ মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের প্রায় চার দশক পরেও দেশে 'যুদ্ধাপরাধী' প্রসঙ্গটি এখন পর্যন্ত একটি বিতর্কিত এবং অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে নতুন প্রজন্মসহ সমগ্র জাতির মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। 'মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি' এবং 'মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি' বলেও আরো দু'টি ধারা তৈরি করে দেশ ও জাতিকে বিভক্ত করার জোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে কোন কোন মহলের পক্ষ থেকে। দেশবাসী যখন বিভিন্ন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ কিংবা বুদ্ধিজীবীদের নিকট থেকে সঠিক দিক নির্দেশনা আশা করে তখন উল্টো সেইসব শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিবর্গের সত্য-মিথ্যায় মিশ্রিত তথাকথিত বুলিতে বিভ্রান্ত হয়ে হতাশার নদীতে ঝাঁপ দিতে বাধ্য হয়। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে এ দেশের বর্তমান প্রজন্ম (যাদের জন্ম ৭১ সালের পরে) কী করে স্বাধীনতার পক্ষ অথবা বিপক্ষ শক্তি হয় তা বোধগম্য হওয়ার কথা নয় কোন সুস্থ মস্তিস্কের সচেতন মানুষের। যে ব্যক্তির জন্মই হয়নি একাত্তর সালে, সে আবার কীভাবে যুদ্ধাপরাধী বা রাজাকার হয়? কিংবা যুদ্ধকালীন সময়ে যার বয়স ৫/৬ বছরের বেশি ছিলনা, সে কী করে যুদ্ধাপরাধী হতে পারে? 'মুক্তিযুদ্ধ' এবং 'যুদ্ধাপরাধী' প্রসঙ্গে সম্পূর্ণ রাজনীতি নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে একটু গভীরভাবে বিষয়টিকে পাঠকদের সামনে উপস্থাপনই মূলতঃ এ নিবন্ধের মূখ্য উদ্দেশ্য।
কেন হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ?
১৯৪৭ সালে যে মহান লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে 'পাকিস্তান' নামক রাষ্ট্রটি স্বাধীনতা লাভ করেছিল তার সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি দীর্ঘ ২৪ বছরেও। বিশেষ করে 'পূর্ব পাকিস্তান' অংশটি 'পশ্চিম পাকিস্তানী' শাসকদের দ্বারা শোষিত হয়ে আসছিল শুরু থেকেই। সেই শোষণ আর বঞ্চনার ফলেই পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল বিশেষভাবে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ৬৯ সালের গণ অভ্যুথানের পথ ধরে ৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ মূলতঃ বাঙালিদের ক্রমাগত ক্ষোভের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ছিল। সেদিন সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বলেই মাত্র নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিজয় অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। ১৯৭১ সালে 'বাংলাদেশ' নামক রাষ্ট্রটিকে যেমন একটি 'ইসলামী রাষ্ট্র' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কোন উদ্দেশ্য ছিল না, ঠিক তেমনিভাবে এ রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষকতা ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠারও কোন চেতনা ছিল না। এমনকি আওয়ামীলীগের যে ৬ দফা এবং ছাত্রদের যে ১১ দফা দাবীকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল সেসবের মধ্যেও ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র কিংবা ইসলাম এসব কোন মতাদর্শেরই উল্লেখ ছিল না। নতুন প্রজন্মের কাছে আজকে এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদ 'ধর্মনিরপেক্ষতা' এবং 'সমাজতন্ত্র'-কে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে পরিচিত করাচ্ছেন, অথচ, এ দু'টির কোনটাই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অংশ নয়। প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানিদের রাজনৈতিক নিপীড়ন, সাংস্কৃতকি আধিপত্য ও অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তির যুদ্ধ।
আমরা কী মুক্ত হতে পেরেছি?
যে চেতনা বুকে ধারণ করে আমরা ৭১ সালের মুক্তিযু্দ্ধে বিজয়ী হয়েছিলাম, তার সফল বাস্তবায়ন হয়নি বিজয় লাভের দীর্ঘ ৩৭ বছরেও। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল একটি স্বাধীন সার্রভৌম রাষ্ট্র যেখানে আমরা হয়েছি একটি লাল-সবুজের পতাকার মালিক মাত্র। অর্থনৈতিক শোষণ আর রাজনৈতিক নিপীড়ন হতে মুক্ত হতে পারেনি এ দেশের জনগণ। মুক্তি পায়নি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকেও। এ দেশের রাজনীতিবিদরার 'মুক্তিযুদ্ধ'-কে পুঁজি করে নিজেদের পকেট ভরতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই। যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন প্রেরণার উৎস, যাকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ, যিনি ঘোষণা করেছিলেন, 'এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম- স্বাধীনতার সংগ্রাম' সেই কালজয়ী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বাঁচতে পারেননি এ দেশের নোংরা রাজনীতির কবল থেকে। ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের সমন্বিত এক অদ্ভূত রাষ্ট্রনীতি দিয়ে দেশ চালাতে গিয়ে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিলেন বাঙালি জাতির এ মহান নায়ক। চুয়াত্তর সালের অনাকাঙ্খিত দুর্ভিক্ষ জাতিকে এক কঠিন বিপদের মুখোমুখি এনে দাঁড় করালো। মুক্তিযুদ্ধের আসল চেতনা, মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধে শহীদদের কথা চিন্তা না করে নিজেদের আখের গোছাত্ই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল এ দেশের স্বার্থপর শাসক গোষ্ঠি। ফলে জনগণ শোষিত হলো সেই আগের মতো্ই। একদলীয় 'বাকশাল' কায়েমের মধ্য দিয়ে তার ষোলকলা পূর্ণ করেছিলেন 'বাংলাদেশ' নামক রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অবশেষে নিহত হলেন তিনি সপরিবারে নির্মমভাবে তাঁরই ঘনিষ্ঠ কিছু ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে। ক্ষমতার মসনদে এলেন বঙ্গবন্ধুর বাকশাল মন্ত্রী সভারই একজন সদস্য 'খোন্দকার মোস্তাক আহমদ'। চলল অবাধে শোষণ প্রক্রিয়া। জাতির ঐ ক্রান্তিকালে ইতিহাসের ধারায় আবির্ভূত হলেন স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে পরিচিত 'জেনারলে জিয়াউর রহমান'। ৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর ঐতিহাসিক সিপাহী বিপ্লবের মাধ্যমে জাতি দ্বিতীয়বারের মতো স্বপ্ন দেখতে পেল স্বাধীনতার। ক্ষমতায় বসলেন জিয়াউর রহমান, কিন্তু ঠিকতে পারলেন না বেশি দিন। বিদ্রোহী সেনাদের হাতে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে তাঁকেও চলে যতে হল। শুরু হল স্বাধীন বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের যুগ। সমালেচালকরা যাই বলেন না কেন, সামরিক শাসক এরশাদও চেষ্টা করলেন টেনেটুনে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার। প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলেন এ দেশের গণতন্ত্রকামী জনসাধারণ।
গণতন্ত্রের মানে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। ৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল। কিন্তু দেশবাসী কী পেল এই গণতন্ত্রে বাস্তবায়নে? ৯৬ সালে সরকার বদল হল, তাতে জনগণের কী প্রাপ্তি ঘটল? শুধু হরতাল, ধর্মঘট, অবরোধ, ভাঙচুর আর রাজপথে মানুষ হত্যার উৎসবই কী তাহলে গণতন্ত্র? দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঘোড়া মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার নামই কী তাহলে স্বাধীনতা?
'যুদ্ধাপরাধী' আসলে কারা?
------------------
১/১১ এর পর দেশের চরম রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংকটেও এই 'যুদ্ধাপরাধী' ইস্যু নিয়ে এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদ, মিডিয়া এবং বুদ্ধিজীবীদের বেশ আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। দেশের অসংখ্য অগণিত সমস্যার কথা চিন্তা না করে এ সমস্ত গুণি ব্যক্তিবর্গ এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বারবার একটি দাবী উত্থাপন করতে থাকেন, 'যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই', 'যুদ্ধাপরাধীদের নিবন্ধন দেওয়া যাবে না' ইত্যাদি। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দেশের প্রধান ও প্রাচীন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ও তাদের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন এবং তাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নির্বাচনী মহাজোটের পক্ষ থেকে এসব কথা বেশি উচ্চারিত হতে থাকে। পরবর্তীতে এটাকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও যোগ করে। মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এ বিষয়টিকে সামনে রেখে 'বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী' নামক সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করা এবং এ সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে 'যুদ্ধাপরাধী' সাব্যস্থ করে তাদের বিচারের ব্যাপারে বিভিন্ন পর্যায়ে বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়া শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার একটি মামলায় জামায়াতের শীর্ষ তিন নেতাকে এবং পরবর্তীতে আরো ২জন শীর্ষ নেতা সহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়। প্রথমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার কথা বললেও পরবর্তীতের জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে আরো অনেক মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনও করা হয় অকল্পনীয়ভাবে। এরই মাঝে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে শুরু হয় প্রহসন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যুদ্ধাপরাধী নির্মূলের নামে আসলে জামায়াতে ইসলামীকেই নির্মূলের টার্গেট করা হয়েছে। এখন কথা হলো জামায়াত কিংবা তাদের নেতৃবৃন্দ কী আসলেই যুদ্ধাপরাধী? যদি তাই হয়, তাহলে কী কেবল তারাই যুদ্ধের সময় অপরাধ করেছেন, অন্য কেউ নয়? আসুন আমরা জেনে নেই যুদ্ধাপরাধী আসলে কারা?
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা অপরাধ করেছিল তারাই প্রকৃতপক্ষে 'যুদ্ধাপরাধী'। সে হিসাবে দেখা যাচ্ছে ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন সময়ের মূল অপরাধী হচ্ছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। জানা যায় পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে যারা যুদ্ধাপরাধী ছিল তাদের বিচারের জন্যই International Crimes (Tribunal) Act করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে মূল যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত ১৯৫ জন পাকিস্তানি নাগরিকের বিচারের জন্য এ আইন তৈরি করা হয়েছিল। বিজ্ঞ জনেরা বলছেন আওয়ামীলীগই অতীতে সব যুদ্ধাপরাধীকে ছেড়ে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের বিচারকার্য শেষ করেন। যারা চিহ্নিত অপরাধী ছিল তাদেরকে তখন শাস্তিও দেওয়া হয়েছিল। এখন একই অপরাধের বিচার কয়বার করা হবে? আর বিচার যদি করতেই হয় তাহলে আগে ক্ষমা করে দেয়া সেই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে পাকিস্তান থেকে ফিরিয়ে এনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। এরপর তাদের সহযোগীদের বিচারের প্রসঙ্গ আসতে পারে। আর সেক্ষেত্রে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যারা প্রতক্ষ্য ও পরোক্ষভাবে পাক সেনাদের সহযোগিতা করেছিল তাদের তালিকা তৈরি করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে ৭১ সালে যে সমস্ত দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিল তাদের মধ্যে রয়েছে 'মুসলিম লীগ', 'নেজামে ইসলাম পাটি' 'জামায়াতে ইসলামী' প্রভৃতি। এসব দলের মদ্যে বর্তমানে কেবল জামায়াতে ইসলামী ভাল অবস্থানে থাকার ফলে সরকারকে তাদের দিকেই নজর দিতে হবে, এটা যৌক্তিক হতে পারে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে এ দেশের অন্য প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোতেও 'যুদ্ধাপরাধী' বা রাজাকারদের অবস্থান থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন কথা কখনোই উঠছেনা। একতরফা ভাবে জামায়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের পাশাপাশি এসব মহলের কাছ থেকে ধর্মীয় রাজনীতি বা ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধেরও দাবী উঠছে বারবার। এখন কথা হচ্ছে মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ জামায়াতের বিভিন্ন নেতা যদি আওয়ামীলীগ বা বিএনপি করতেন তাহলে কী এমন অভিযোগ উত্থাপিত হতো তাদের বিরুদ্ধে? শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কাউকে 'যুদ্ধাপরাধী' হিসবে চিহ্নিত করাটা যৌক্তিক হতে পারেনা।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে 'যুদ্ধাপরাধী' প্রসঙ্গটা কী একেবারেই অযৌক্তিক? নিশ্চয়ই না? কিন্তু মুক্তিযু্দ্ধের ৩৯ বছর পরে হঠাৎ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যমক্রম নিয়ে সাধারণ মানুষের সন্দেহ বা সংশয় থাকতেই পারে। 'যুদ্ধাপরাধী' শব্দটিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যুদ্ধের সময়ে যারা সুনির্দিষ্ট অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তারাই হচ্ছে 'যুদ্ধাপরাধী'। যেমন- যুদ্ধের সময় সরাসরি যুদ্ধে জড়িত নয় এমন নারী, শিশু, ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে হত্যা করা, বেসামরিক বাড়িঘর, স্থাপনা, দোকানপাট, শস্য ভাণ্ডার বা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি লুটপাট বা অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ প্রভৃতি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ জাতীয় অনেক অপরাধই সংঘটিত হয়েছে। যারা এসব অপরাধা করেছে তারাই মূলত যুদ্ধাপরাধী। রাজনৈতিক কারণে জামায়াতসহ বিভিন্ন দল মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিলেও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা স্বাধীনতাকে মেনে নিয়েছে। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের মতো অপরাধে জড়িতদের বাদে শুধু রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি বা বিরোধীতা করেছিল তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। ঐসময় প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের যথাসম্ভব চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে জামায়াতেরও অনেকেই ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত 'যুদ্ধাপরাধী' হিসেবে চিহ্নিত হয়নি কিংবা জামায়াতের বর্তমান নেতৃবৃন্দের মধ্যে কেউই সে সময় 'যুদ্ধাপরাধী' হিসেবে চিহ্নিত হয়ে সাজাভোগ করেন নি।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
----------------------------
চলমান বিচার প্রক্রিয় নিয়ে শংকিত আইন বিশেষজ্ঞরা
................................................................
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেছেন, স্বাধীনতার পরও মানবতাবিরোধী অনেক অপরাধ হয়েছে। যা এই International Crimes (Tribunal) Act- এ আসতে পারে। যেহেতু যুদ্ধাপরাধ নয় বরং ৭১ সালে যুদ্ধকালীন সময়ে সংঘটিত মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, সুতরাং স্বাধীনতা পরবর্তী রক্ষীবাহিনীর নির্যাতনকেও মানবতাবিরোধী আইনের অন্তভূক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, ন্যায় বিচার না হলে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ১০ অপরাধীকে খালাস দেয়ার চেয়ে একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে সাজা দেওয়ার পরিণাম হবে ভয়াবহ। বর্তমানে যে আইনে বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তাতে কোন অবস্থাতেই সুবিচার করার সুযোগ নেই। আর এমন কোন বিচার করবেন না, যাতে আপনাদের আবার বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি, প্রফেসর ড. এমাজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ জঘন্য অপরাধেল সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তান আর্মি সদস্যদের কোন কথাই এখন উচ্চারিত হচ্ছে না। বিচার যদি করতেই হয় তাহলে আগে ক্ষমা করে দেয়া সেই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে পাকিস্তান থেকে ফিরিয়ে এনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। এর পর সহযোগীদের বিচারের প্রশ্ন আসবে। কিন্তু সরকার বিচারের উদ্দেশ্যে কিছুই করছে না। সরকারের কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে তারা বিরোধী পক্ষকে ঘায়েল করার জন্যই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে। এটা কোন অবস্থায়ই গ্রহণযোগ্য হবে না।
সাবেক স্পিকার ব্যারিষ্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেছেন, কথিত International Crimes (Tribunal) Act অনুযায়ী বিচারক নিজেই তার সুবিধামতো আইন প্রণয়ন করতে পারবেন। এরূপ বিধান দুনিয়ার কোন সভ্য সমাজের আইন হতে পারে না। এটা কোর্ট মার্শালের চেয়েও ভয়াবহ। একতরফা বিচারের শামিল। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলেই তাকে গ্রেফতার করা হবে, আর তাকে জামিন দেয়া হবে না এমন বিধান রয়েছে এ আইনে। এতে ন্যায় বিচার আশা করা যায় না।
সাবেক আইন মন্ত্রী ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, ১৯৭৩ সালের আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী বন্দির বিচার সম্পন্ন করা। সহযোগী দালালদের জন্য নয়। ১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই সংবিধানের প্রথম সংশোধনী আইন পাস হয়। এ সংশোধনী অভিযুক্ত ব্যক্তির ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন Judicial Review- এর অধিকারও খর্ব করেছে। এ আইনটিতে যে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া হয়েছে তাও আপত্তিকর। এ আইনে নির্দোষিতার অনুমান (Presumption of innocence) ও জামিনের বিধান না থাকায় তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়।
ব্যারিষ্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ১৯৭৩ সালের আইনটি একটি ত্রৃটিযুক্ত আইন। এ আইনের প্রয়োগ অসাংবিধানিক। এর আলোকে বিচার হলে তা হবে অবৈধ। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে এ আইনের তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। এ আইনে অভিযুক্তের অধিকার রক্ষিত হয়নি।
ব্যরিষ্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, এ বিচার আরেক ধরনের মানবতাবিরোধী কাজ হবে। মইন-ফখরুদ্দীনের সময়ে যে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হয়েছে তা বাদ রেখে হঠাৎ করে ৩৯ বছর আগের এ বিষয় নিয়ে সরকারের বাড়াবাড়ি সন্দেহের উদ্রেক করেছে।
ব্যারিষ্টার ফাতেমা আনোয়ার বলেছেন, ১৯৭৩ সালের আইনটির আন্তর্জাতিক আইনের বিষয়ের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালকে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারের অনেকটাই এখানে অভিযুক্তের পক্ষে সংরক্ষণ করা হয়নি। প্রচলিত সাক্ষ্য আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি অপ্রয়োজনে যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ব্যারিষ্টার বেলায়েত হোসেন বলেছেন, আইনটিতে কোন গাইডলাইন ছাড়াই বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনাল তার নিজস্ব বিধি প্রণয়ন করবে। এতে সর্বোচ্ছ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড থেকে যে কোন শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। অথচ কোন গাইডলাইন নেই। একদিকে দীর্ঘদিন আগের অপরাধ, অন্যদিকে আইনের দুর্বলতা কীভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে তা সচেতন মহলের বুঝে আসছেন।
প্রথমদিকে এই 'যুদ্ধাপরাধী' সংক্রান্ত বিষয়টি আওয়ামিলীগ ঢাকঢোল পিটিয়ে বললেও তাঁদের আইন মন্ত্রী ব্যারিষ্টার শফিক আহমদ যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষ করে এসে বলেছিলেন, 'যুদ্ধাপরাধী' বলা যাবেনা, বলতে হবে 'মানবতা বিরোধী অপরাধ'। তারপরও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, এমপি ও সরকারি দলের নেতার দেদারসে 'যুদ্ধাপরাধের বিচার' বলে মাঠ কাঁপাচ্ছেন!
কেন হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ?
১৯৪৭ সালে যে মহান লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে 'পাকিস্তান' নামক রাষ্ট্রটি স্বাধীনতা লাভ করেছিল তার সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি দীর্ঘ ২৪ বছরেও। বিশেষ করে 'পূর্ব পাকিস্তান' অংশটি 'পশ্চিম পাকিস্তানী' শাসকদের দ্বারা শোষিত হয়ে আসছিল শুরু থেকেই। সেই শোষণ আর বঞ্চনার ফলেই পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল বিশেষভাবে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ৬৯ সালের গণ অভ্যুথানের পথ ধরে ৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ মূলতঃ বাঙালিদের ক্রমাগত ক্ষোভের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ছিল। সেদিন সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বলেই মাত্র নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিজয় অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। ১৯৭১ সালে 'বাংলাদেশ' নামক রাষ্ট্রটিকে যেমন একটি 'ইসলামী রাষ্ট্র' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কোন উদ্দেশ্য ছিল না, ঠিক তেমনিভাবে এ রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষকতা ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠারও কোন চেতনা ছিল না। এমনকি আওয়ামীলীগের যে ৬ দফা এবং ছাত্রদের যে ১১ দফা দাবীকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল সেসবের মধ্যেও ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র কিংবা ইসলাম এসব কোন মতাদর্শেরই উল্লেখ ছিল না। নতুন প্রজন্মের কাছে আজকে এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদ 'ধর্মনিরপেক্ষতা' এবং 'সমাজতন্ত্র'-কে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে পরিচিত করাচ্ছেন, অথচ, এ দু'টির কোনটাই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অংশ নয়। প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানিদের রাজনৈতিক নিপীড়ন, সাংস্কৃতকি আধিপত্য ও অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তির যুদ্ধ।
আমরা কী মুক্ত হতে পেরেছি?
যে চেতনা বুকে ধারণ করে আমরা ৭১ সালের মুক্তিযু্দ্ধে বিজয়ী হয়েছিলাম, তার সফল বাস্তবায়ন হয়নি বিজয় লাভের দীর্ঘ ৩৭ বছরেও। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল একটি স্বাধীন সার্রভৌম রাষ্ট্র যেখানে আমরা হয়েছি একটি লাল-সবুজের পতাকার মালিক মাত্র। অর্থনৈতিক শোষণ আর রাজনৈতিক নিপীড়ন হতে মুক্ত হতে পারেনি এ দেশের জনগণ। মুক্তি পায়নি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকেও। এ দেশের রাজনীতিবিদরার 'মুক্তিযুদ্ধ'-কে পুঁজি করে নিজেদের পকেট ভরতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই। যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন প্রেরণার উৎস, যাকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ, যিনি ঘোষণা করেছিলেন, 'এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম- স্বাধীনতার সংগ্রাম' সেই কালজয়ী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বাঁচতে পারেননি এ দেশের নোংরা রাজনীতির কবল থেকে। ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের সমন্বিত এক অদ্ভূত রাষ্ট্রনীতি দিয়ে দেশ চালাতে গিয়ে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিলেন বাঙালি জাতির এ মহান নায়ক। চুয়াত্তর সালের অনাকাঙ্খিত দুর্ভিক্ষ জাতিকে এক কঠিন বিপদের মুখোমুখি এনে দাঁড় করালো। মুক্তিযুদ্ধের আসল চেতনা, মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধে শহীদদের কথা চিন্তা না করে নিজেদের আখের গোছাত্ই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল এ দেশের স্বার্থপর শাসক গোষ্ঠি। ফলে জনগণ শোষিত হলো সেই আগের মতো্ই। একদলীয় 'বাকশাল' কায়েমের মধ্য দিয়ে তার ষোলকলা পূর্ণ করেছিলেন 'বাংলাদেশ' নামক রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অবশেষে নিহত হলেন তিনি সপরিবারে নির্মমভাবে তাঁরই ঘনিষ্ঠ কিছু ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে। ক্ষমতার মসনদে এলেন বঙ্গবন্ধুর বাকশাল মন্ত্রী সভারই একজন সদস্য 'খোন্দকার মোস্তাক আহমদ'। চলল অবাধে শোষণ প্রক্রিয়া। জাতির ঐ ক্রান্তিকালে ইতিহাসের ধারায় আবির্ভূত হলেন স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে পরিচিত 'জেনারলে জিয়াউর রহমান'। ৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর ঐতিহাসিক সিপাহী বিপ্লবের মাধ্যমে জাতি দ্বিতীয়বারের মতো স্বপ্ন দেখতে পেল স্বাধীনতার। ক্ষমতায় বসলেন জিয়াউর রহমান, কিন্তু ঠিকতে পারলেন না বেশি দিন। বিদ্রোহী সেনাদের হাতে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে তাঁকেও চলে যতে হল। শুরু হল স্বাধীন বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের যুগ। সমালেচালকরা যাই বলেন না কেন, সামরিক শাসক এরশাদও চেষ্টা করলেন টেনেটুনে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার। প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলেন এ দেশের গণতন্ত্রকামী জনসাধারণ।
গণতন্ত্রের মানে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। ৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল। কিন্তু দেশবাসী কী পেল এই গণতন্ত্রে বাস্তবায়নে? ৯৬ সালে সরকার বদল হল, তাতে জনগণের কী প্রাপ্তি ঘটল? শুধু হরতাল, ধর্মঘট, অবরোধ, ভাঙচুর আর রাজপথে মানুষ হত্যার উৎসবই কী তাহলে গণতন্ত্র? দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঘোড়া মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার নামই কী তাহলে স্বাধীনতা?
'যুদ্ধাপরাধী' আসলে কারা?
------------------
১/১১ এর পর দেশের চরম রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংকটেও এই 'যুদ্ধাপরাধী' ইস্যু নিয়ে এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদ, মিডিয়া এবং বুদ্ধিজীবীদের বেশ আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। দেশের অসংখ্য অগণিত সমস্যার কথা চিন্তা না করে এ সমস্ত গুণি ব্যক্তিবর্গ এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বারবার একটি দাবী উত্থাপন করতে থাকেন, 'যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই', 'যুদ্ধাপরাধীদের নিবন্ধন দেওয়া যাবে না' ইত্যাদি। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দেশের প্রধান ও প্রাচীন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ও তাদের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন এবং তাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নির্বাচনী মহাজোটের পক্ষ থেকে এসব কথা বেশি উচ্চারিত হতে থাকে। পরবর্তীতে এটাকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও যোগ করে। মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এ বিষয়টিকে সামনে রেখে 'বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী' নামক সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করা এবং এ সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে 'যুদ্ধাপরাধী' সাব্যস্থ করে তাদের বিচারের ব্যাপারে বিভিন্ন পর্যায়ে বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়া শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার একটি মামলায় জামায়াতের শীর্ষ তিন নেতাকে এবং পরবর্তীতে আরো ২জন শীর্ষ নেতা সহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়। প্রথমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার কথা বললেও পরবর্তীতের জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে আরো অনেক মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনও করা হয় অকল্পনীয়ভাবে। এরই মাঝে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে শুরু হয় প্রহসন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যুদ্ধাপরাধী নির্মূলের নামে আসলে জামায়াতে ইসলামীকেই নির্মূলের টার্গেট করা হয়েছে। এখন কথা হলো জামায়াত কিংবা তাদের নেতৃবৃন্দ কী আসলেই যুদ্ধাপরাধী? যদি তাই হয়, তাহলে কী কেবল তারাই যুদ্ধের সময় অপরাধ করেছেন, অন্য কেউ নয়? আসুন আমরা জেনে নেই যুদ্ধাপরাধী আসলে কারা?
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা অপরাধ করেছিল তারাই প্রকৃতপক্ষে 'যুদ্ধাপরাধী'। সে হিসাবে দেখা যাচ্ছে ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন সময়ের মূল অপরাধী হচ্ছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। জানা যায় পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে যারা যুদ্ধাপরাধী ছিল তাদের বিচারের জন্যই International Crimes (Tribunal) Act করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে মূল যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত ১৯৫ জন পাকিস্তানি নাগরিকের বিচারের জন্য এ আইন তৈরি করা হয়েছিল। বিজ্ঞ জনেরা বলছেন আওয়ামীলীগই অতীতে সব যুদ্ধাপরাধীকে ছেড়ে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের বিচারকার্য শেষ করেন। যারা চিহ্নিত অপরাধী ছিল তাদেরকে তখন শাস্তিও দেওয়া হয়েছিল। এখন একই অপরাধের বিচার কয়বার করা হবে? আর বিচার যদি করতেই হয় তাহলে আগে ক্ষমা করে দেয়া সেই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে পাকিস্তান থেকে ফিরিয়ে এনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। এরপর তাদের সহযোগীদের বিচারের প্রসঙ্গ আসতে পারে। আর সেক্ষেত্রে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যারা প্রতক্ষ্য ও পরোক্ষভাবে পাক সেনাদের সহযোগিতা করেছিল তাদের তালিকা তৈরি করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে ৭১ সালে যে সমস্ত দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিল তাদের মধ্যে রয়েছে 'মুসলিম লীগ', 'নেজামে ইসলাম পাটি' 'জামায়াতে ইসলামী' প্রভৃতি। এসব দলের মদ্যে বর্তমানে কেবল জামায়াতে ইসলামী ভাল অবস্থানে থাকার ফলে সরকারকে তাদের দিকেই নজর দিতে হবে, এটা যৌক্তিক হতে পারে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে এ দেশের অন্য প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোতেও 'যুদ্ধাপরাধী' বা রাজাকারদের অবস্থান থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন কথা কখনোই উঠছেনা। একতরফা ভাবে জামায়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের পাশাপাশি এসব মহলের কাছ থেকে ধর্মীয় রাজনীতি বা ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধেরও দাবী উঠছে বারবার। এখন কথা হচ্ছে মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ জামায়াতের বিভিন্ন নেতা যদি আওয়ামীলীগ বা বিএনপি করতেন তাহলে কী এমন অভিযোগ উত্থাপিত হতো তাদের বিরুদ্ধে? শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কাউকে 'যুদ্ধাপরাধী' হিসবে চিহ্নিত করাটা যৌক্তিক হতে পারেনা।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে 'যুদ্ধাপরাধী' প্রসঙ্গটা কী একেবারেই অযৌক্তিক? নিশ্চয়ই না? কিন্তু মুক্তিযু্দ্ধের ৩৯ বছর পরে হঠাৎ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যমক্রম নিয়ে সাধারণ মানুষের সন্দেহ বা সংশয় থাকতেই পারে। 'যুদ্ধাপরাধী' শব্দটিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যুদ্ধের সময়ে যারা সুনির্দিষ্ট অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তারাই হচ্ছে 'যুদ্ধাপরাধী'। যেমন- যুদ্ধের সময় সরাসরি যুদ্ধে জড়িত নয় এমন নারী, শিশু, ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে হত্যা করা, বেসামরিক বাড়িঘর, স্থাপনা, দোকানপাট, শস্য ভাণ্ডার বা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি লুটপাট বা অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ প্রভৃতি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ জাতীয় অনেক অপরাধই সংঘটিত হয়েছে। যারা এসব অপরাধা করেছে তারাই মূলত যুদ্ধাপরাধী। রাজনৈতিক কারণে জামায়াতসহ বিভিন্ন দল মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিলেও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা স্বাধীনতাকে মেনে নিয়েছে। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের মতো অপরাধে জড়িতদের বাদে শুধু রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি বা বিরোধীতা করেছিল তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। ঐসময় প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের যথাসম্ভব চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে জামায়াতেরও অনেকেই ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত 'যুদ্ধাপরাধী' হিসেবে চিহ্নিত হয়নি কিংবা জামায়াতের বর্তমান নেতৃবৃন্দের মধ্যে কেউই সে সময় 'যুদ্ধাপরাধী' হিসেবে চিহ্নিত হয়ে সাজাভোগ করেন নি।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
----------------------------
চলমান বিচার প্রক্রিয় নিয়ে শংকিত আইন বিশেষজ্ঞরা
................................................................
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেছেন, স্বাধীনতার পরও মানবতাবিরোধী অনেক অপরাধ হয়েছে। যা এই International Crimes (Tribunal) Act- এ আসতে পারে। যেহেতু যুদ্ধাপরাধ নয় বরং ৭১ সালে যুদ্ধকালীন সময়ে সংঘটিত মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, সুতরাং স্বাধীনতা পরবর্তী রক্ষীবাহিনীর নির্যাতনকেও মানবতাবিরোধী আইনের অন্তভূক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, ন্যায় বিচার না হলে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ১০ অপরাধীকে খালাস দেয়ার চেয়ে একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে সাজা দেওয়ার পরিণাম হবে ভয়াবহ। বর্তমানে যে আইনে বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তাতে কোন অবস্থাতেই সুবিচার করার সুযোগ নেই। আর এমন কোন বিচার করবেন না, যাতে আপনাদের আবার বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি, প্রফেসর ড. এমাজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ জঘন্য অপরাধেল সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তান আর্মি সদস্যদের কোন কথাই এখন উচ্চারিত হচ্ছে না। বিচার যদি করতেই হয় তাহলে আগে ক্ষমা করে দেয়া সেই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে পাকিস্তান থেকে ফিরিয়ে এনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। এর পর সহযোগীদের বিচারের প্রশ্ন আসবে। কিন্তু সরকার বিচারের উদ্দেশ্যে কিছুই করছে না। সরকারের কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে তারা বিরোধী পক্ষকে ঘায়েল করার জন্যই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে। এটা কোন অবস্থায়ই গ্রহণযোগ্য হবে না।
সাবেক স্পিকার ব্যারিষ্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেছেন, কথিত International Crimes (Tribunal) Act অনুযায়ী বিচারক নিজেই তার সুবিধামতো আইন প্রণয়ন করতে পারবেন। এরূপ বিধান দুনিয়ার কোন সভ্য সমাজের আইন হতে পারে না। এটা কোর্ট মার্শালের চেয়েও ভয়াবহ। একতরফা বিচারের শামিল। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলেই তাকে গ্রেফতার করা হবে, আর তাকে জামিন দেয়া হবে না এমন বিধান রয়েছে এ আইনে। এতে ন্যায় বিচার আশা করা যায় না।
সাবেক আইন মন্ত্রী ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, ১৯৭৩ সালের আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী বন্দির বিচার সম্পন্ন করা। সহযোগী দালালদের জন্য নয়। ১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই সংবিধানের প্রথম সংশোধনী আইন পাস হয়। এ সংশোধনী অভিযুক্ত ব্যক্তির ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন Judicial Review- এর অধিকারও খর্ব করেছে। এ আইনটিতে যে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া হয়েছে তাও আপত্তিকর। এ আইনে নির্দোষিতার অনুমান (Presumption of innocence) ও জামিনের বিধান না থাকায় তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়।
ব্যারিষ্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ১৯৭৩ সালের আইনটি একটি ত্রৃটিযুক্ত আইন। এ আইনের প্রয়োগ অসাংবিধানিক। এর আলোকে বিচার হলে তা হবে অবৈধ। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে এ আইনের তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। এ আইনে অভিযুক্তের অধিকার রক্ষিত হয়নি।
ব্যরিষ্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, এ বিচার আরেক ধরনের মানবতাবিরোধী কাজ হবে। মইন-ফখরুদ্দীনের সময়ে যে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হয়েছে তা বাদ রেখে হঠাৎ করে ৩৯ বছর আগের এ বিষয় নিয়ে সরকারের বাড়াবাড়ি সন্দেহের উদ্রেক করেছে।
ব্যারিষ্টার ফাতেমা আনোয়ার বলেছেন, ১৯৭৩ সালের আইনটির আন্তর্জাতিক আইনের বিষয়ের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালকে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারের অনেকটাই এখানে অভিযুক্তের পক্ষে সংরক্ষণ করা হয়নি। প্রচলিত সাক্ষ্য আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি অপ্রয়োজনে যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ব্যারিষ্টার বেলায়েত হোসেন বলেছেন, আইনটিতে কোন গাইডলাইন ছাড়াই বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনাল তার নিজস্ব বিধি প্রণয়ন করবে। এতে সর্বোচ্ছ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড থেকে যে কোন শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। অথচ কোন গাইডলাইন নেই। একদিকে দীর্ঘদিন আগের অপরাধ, অন্যদিকে আইনের দুর্বলতা কীভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে তা সচেতন মহলের বুঝে আসছেন।
প্রথমদিকে এই 'যুদ্ধাপরাধী' সংক্রান্ত বিষয়টি আওয়ামিলীগ ঢাকঢোল পিটিয়ে বললেও তাঁদের আইন মন্ত্রী ব্যারিষ্টার শফিক আহমদ যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষ করে এসে বলেছিলেন, 'যুদ্ধাপরাধী' বলা যাবেনা, বলতে হবে 'মানবতা বিরোধী অপরাধ'। তারপরও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, এমপি ও সরকারি দলের নেতার দেদারসে 'যুদ্ধাপরাধের বিচার' বলে মাঠ কাঁপাচ্ছেন!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন