বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০১১

বেকারত্বঃ যেখানে লুকিয়ে রয়েছে সীমাহীন সম্ভাবনা

পৃথিবীর মানচিত্রে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম অথচ একটি অপার সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। বর্তমানে এ দেশে প্রায় ১৫ কোটি লোকের মধ্যে ৪৪% লোকই দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে। এ দেশে শিক্ষিতের হার ৬৫% হলেও দেশের মোট জনশক্তির প্রায় এক তৃতীয়াংশ কর্মসংস্থানের অভাবে বেকারত্বের জীবন যাপন করছে যাদের অধিকাংশই শিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত কিংবা কমপক্ষে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন। যদিও বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ এবং এখানকার জনসংখ্যার প্রায় ৭০% এখনও নানাভাবে কৃষি তৎপরতার উপর নির্ভরশীল, তথাপি সঠিক দিক নির্দেশনা এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবে কৃষি খাতকে ভিত্তি করে এখন পর্যন্ত এ দেশে চোখে পড়ার মতো কোন প্রকল্প তৈরি হয়নি। তেমনিভাবে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, মৎস সম্পদ, বনজ সম্পদ, স্বাস্থ্য সেবা, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং বিশেষ করে শিক্ষা আন্দোলনে জাতি এখনো কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। যার ফলে দেশের অন্যতম বড় সম্পদ 'জনসংখ্যা' এখন বড় ধরনের একটি সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশায় ভুগছে।

বেকারত্ব সম্পর্কে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মত রয়েছে। তবে অধিকাংশ অর্থনীতিবিদদের ধারণার আলোকে বলা যায়, বেকারত্ব বলতে এমন অবস্থাকে বুঝায় যাতে কর্মক্ষম শ্রমিকরা প্রচলিত মজুরীতে কাজ করতে ইচ্ছুক হওয়া সত্তেও তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কোন কাজ পাওয়া যায় না। এখানে 'বেকারত্ব' বলতে অনিচ্ছাকৃত বেকারত্বকেই বুঝানো হয়েছে। অধ্যাপক পিগুর ভাষায়, 'ঐ অবস্থাকেই বেকারত্ব বলা হয় যখন কর্মক্ষম ব্যক্তিরা ইচ্ছা থাকা সত্তেও যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পায় না।' এখানেও অনিচ্ছাকৃত বেকারত্বের কথাই বলা হয়েছে। বিত্তবান লোকের সন্তান যাদেরকে আলালের ঘরের দুলাল বলা হয় তাদেরকে বেকারদের তালিকায় ফেলা ঠিক নয়। কারণ তারা কর্মক্ষম হওয়া সত্তেও কোন কাজ না করে বাপ দাদার সঞ্চিত সম্পত্তি ভোগ করে আলস্যে দিন কাটায়। এরূপ ইচ্ছাকৃত কর্মবিমুখদের ঠিক বেকার বলা না গেলেও, এরাও কিন্তু এ জাতির জন্য একটি অভিশাপ। বাংলাদেশের অনিচ্ছাকৃত বেকারদের সংখ্যা কত যে আশংকাজনকহারে বাড়ছে তা প্রতীয়মান হয় চাকরীর জন্য আবেদনকারীদের প্রতিযোগিতায়। ২০০৭ সালে এই ব্লগারের মালিকানাধীন একটি প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে 'অফিস সহকারী' পদে নিয়োগ দানের লক্ষ্যে দৈনিক শ্যামল সিলেটে ছোট্র একটি সার্কুলার দেওয়া হয়েছিল। আবেদনকারীর যোগ্যতা চাওয়া হয়েছিল এইচ.এস.সি পাশ। সেই একটি পদে আবেদন পড়েছিল সর্বমোট ৪৩টি যার মধ্যে অনার্স- মাষ্টার্স ডিগ্রীধারীরাও ছিলেন। ইন্টারভিউ বোর্ডে একজন আবেদনকারী এই ব্লগারকে বলেছিলেন, 'স্যার, চাকরীটা আমার হবে তো? আমার চাকরীটা খুবই দরকার স্যার। আমার বাবা নেই, মা অসুস্থ। পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ নেই। একটু দয়া করুন স্যার।' তার সেই আবেদনে এই ব্লগারের হৃদয়কে বুলেটবিদ্ধ করতে পারলেও তাকে চাকরী দেওয়া সম্ভব হয়নি। বাস্তব জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে বেকারত্ব একটি বড় ধরনের সামাজিক সমস্যা। অনেক আশা ভরসা নিয়ে ছেলে-মেয়েরা লেখা পড়া শেষ করে চাকরীর সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী চাকরী না হওয়ার ফলে তাদেরকে সমাজে অপমান আর অবহেলার শিকারই হতে হয় সবচেয়ে বেশি। কারো সাথে দেখা হলেই জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কী কর?’ এ জাতীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে অভ্যস্থ নয় বেকারেরা। কারণ আসলে তারা কী করে তা তারা নিজেরাই জানে না। সার্টিফিকেট ফাইলবন্দী করে, পে-অর্ডার আর ব্যাংক ড্রাফট করে এবং সার্টিফিকেট ফটোকপি করে রিক্সা ভাড়া দিয়ে এ সব বেকারের আয়ের উতস না থাকা সত্তেও ব্যয় নির্বাহ করতে হয় মাসে অন্তত ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। দেশ ও সমাজের উচ্চ পর্যায়ের কোন কর্তা ব্যক্তির সামনে এসব বেকার গিয়ে হাজির হলে কেউ ‘দূর হও’ বলে তাড়িয়ে দেন আর কেউ বড়জোর ‘আহারে’ বলে একটি নি:শ্বাস ফেলেন মাত্র। বেকার সমস্যা কীভাবে দূর করা যায়, সেই চিন্তা করার সময়টুকুও তাদের নেই।


এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বর্তমানে দেশের কর্মক্ষম জনশক্তির ৪০ শতাংশই বেকার। চাহিদা মতো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না বলেই বেকার যুবকের সংখ্যা বাড়ছে আশংকাজনকভাবে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা, কর্মক্ষম যুবশক্তি কোন নির্দিষ্ট কাজে জড়িত না থাকলে অপরাধ প্রবণতার দিকে ঝুকে পড়াটা তাদের জন্য অস্বাভাবিক নয়। আর এজন্যই সমাজে সন্ত্রাস, চাদাবাজি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ওয়াদার মধ্যে ছিল ক্ষমতায় গেলে প্রতিটি পরিবারের একজনের চাকরীর ব্যবস্থা করা হবে। বিষয়টি কতটুকু অবাস্তব তা এ ব্লগের পরিসংখ্যান থেকেই যে কোন সাধারণ লোকও বুঝতে পারবে।

বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশে এখন বেকারের সংখ্যা ৫ কোটির উপরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৫ সালে দেশে বেকারের হার বর্তমান থেকে দ্বিগুণ হবে। প্রতি বছর প্রায় ২৭ লাখ ছেলে-মেয়ে দেশ প্রথমবারের মতো চাকরীর বাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু এদের মধ্যে মাত্র ৭ লাখের কর্মসংস্থান হচ্ছে। আর এরা সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমলেও নতুন কাজের সুযোগ তৈরি না থাকায় বেকারত্ব বেড়ে চলেছে। ৯০ দশকে বেকারত্ব বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৯ শতাংশ। কিন্তু গত ১০ বছরে তা বেড়ে দাড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে। ব্যুরোর মতে, ২০০০ সালে দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪০ লাখ। সে সময় কর্মক্ষম নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ২ লাখ। মোট জনসংখ্যা ছিল ১৩ কোটি। জনগোষ্ঠির ৪০ শতাংশকেই বেকার বলে উল্লেখ করা হয়। সেই হিসেবে বর্তমানে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে সাড়ে ৬ কোটিই বেকার!

বেকারত্ব দূর করার জন্য উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের সম্প্রারণ, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্প বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা দরকার। সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত। শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে কর্মমূখী শিক্ষার দিকে ঝুকতে হবে। কম্পিউটার, তথ্য-প্রযুক্তি, কুটির শিল্প কিংবা কৃষি খাতে স্বল্প বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। বর্তমান সরকার বেকারত্ব নিরসনের প্রতিশ্রুতি দয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। তাদের সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রীয় খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। সম্ভাবনাময় যুবশক্তিকে ‘বোঝা’ হিসেবে নয় ‘সম্পদ’ হিসেবে বিবেচনা করে তাদেরকে কাজে লাগাতে হবে, কাজ দিতে হবে। অন্যথায় জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য।
 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন