বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০১১

রহস্য উপন্যাস- 'নয়া জীবনের হাতছানি'

undefined
পূর্ব কথা
[এই উপন্যাসের কাহিনী সম্পূর্ণ কাল্পনিক। জীবিত কিংবা মৃত কারো সাথে কাকতালীয়ভাবে কাহিনীর কোন মিল পাওয়া গেলে সেটাকে কাকতালীয় ঘটনাই মনে করতে হবে। ব্লগে প্রকাশের পূর্বে এই পর্বটি দৈনিক প্রভাত বেলার শিশু-কিশোর পাতা অঙ্কুরে এবং শিশু-কিশোর পত্রিকা মাসিক কচি-তে ছাপা হয়েছে। ]


বাঁধন সবেমাত্র স্কুল থেকে ফিরেছে। এমন সময় দেখতে পেল রাস্তায় মানুষের ভীড়। কৌতুহলী মনে সে দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠলো। পাশের বাড়ির মারজানকে পেটানো হচেছ। পেটাচ্ছেন মারজানেরই বাবা। লোকজন এসেছে মারজানকে বাঁচাতে, কিন্তু কেউই মারজানের বাবা আরমান আলীর হাত থেকে লাঠিটা সরাতে পারছে না। আরমান আলী তার ছেলের উপর অমানবিক নির্যাতন চালাচ্ছেন, আর বাড়ির সকলে সে দৃশ্য দেখছেন নাটক-সিনেমার মতোই। বিষয়টি সত্যি বেদনাদায়ক! 

বাঁধন সবেমাত্র ক্লাস এইটে পড়ে আর মারজান তারই ক্লাসমেট। তবে মারজান সবক্ষেত্রেই বাঁধনের বিপরীত প্রকৃতির ছেলে। লেখাপড়া করেনা বললেই চলে। সারাদিন ক্লাস ফাঁকি দিয়ে খারাপ ছেলেদের সাথে আড্ডা দেয়। এই বয়সে সিগারেট পর্যন্ত টানার অভ্যাস করে ফেলেছে। মারজানকে তার বাবা-মা এমনকি চাচারাও প্রায়ই বেত্রাঘাত করেন। কিন্তু কোন ফল পাওয়া যায়না। মার খাওয়ার সময় কান্নার আওয়াজে সারা গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে যান। সে তখন সুর করে বলে, 'আমি আর এসব করবনা। আমি তোমাদের কথামতো চলব।' কিন্তু পরদিন থেকে ঠিকই সে তার কর্ম চালিয়ে যায় আগের মতোই।

বাঁধন একটি বিষয় লক্ষ্য করল, অন্যদিন মারজানকে পেটানোর সময় তার দাদী এসে তাকে বাঁচাতো, কিন্তু আজ তাঁকেও দেখা যাচ্ছে না। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া বাঁধনের এখন আর কিছুই করার নেই। প্রায় আধঘন্টা পেটানোর পর মারজান অজ্ঞান হয়ে গেল। মারজানের বাবা এতটা আশা করেননি। নিজের ভুল বুঝতে পেরে দ্রুত ছেলেকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। মফস্বলে বাড়ি মারজানদের। ঝিনাইদহ জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় হাকিমপুর (কল্পিত নাম) গ্রামে জন্ম তার। হাকিমপুরের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করার কিছুক্ষণ পর ডাক্তাররা ওকে জেলা সদরে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। হাসপাতালে মারজানের মা, দাদীসহ সবাই উপস্থিত ছিলেন। সদর হাসপাতালে পাঠানোর ব্যাপারে সবাই একমত হলেন। মারজানকে নিয়ে তার পিতা আরমান আলী ঝিনাইধহ সদর হাসপাতালে চলে গেলেন। দু'দিন চিকিৎসার পর মারজানকে সুস্থ দেখা গেল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মারজানের ছাড়পত্র তৈরি করতে লাগল। ঠিক হলো রাত শেষ হলেই ভোরে মারজানকে নিয়ে আরমান আলী বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন।

 হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মারজান ভাবছিল তার করুণ জীবনের কথা। নিজের কারণেই তার এত দুর্ভোগ। কিন্তু দুষ্টুমি করা কী সে আদৌ ছাড়তে পারবে? পূর্বে বাবা মেরেছেন কিন্তু এবারের মতো নয়। মারজানের মাথায় হঠাৎ একটা চিন্তা এসে গেল। কী লাভ বন্দী জীবনে থেকে। আবার তো বাবা তাকে এমনভাবে পেটাবেন। কারণ সে তো অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটাতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ঠিক রাত ১২টার সময় মারজান সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। পালাতে হবে, যে করেই হোক তার স্বাধীন থাকা চাই। স্কুলের পড়া আর ভাল লাগে না। ভাল লাগে না বাবা-মা আর টিচারদের বকুনি। গরু পেটানোর মতো বেত্রাঘাত স্কুলে এবং বাড়িতে আর সে খেতে চায়না। এবার তো বাবা তাকে প্রায় মেরেই ফেলেছিলেন। না হয় অন্যায় কাজ করেছি, তাই বলে মেরে ফেলবে? মোহাম্মদ স্যারের মেয়েকে চোখ মেরেছি বলে শেষ পর্যন্ত বাবা আমাকে মেরে ফেলতে চাইল। ভাবনার সাগরে হাবুডুবু খেতে লাগল মারজান। আরমান আলী শুয়েছিলেন তার পাশের বেডে। তিনি তখন গভীর ঘুমে অচেতন।

রাত ১২টার পরে ঝিনাইদহ শহর সাধারণত নিরব থাকে। আজও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে রাস্তায় মারজানের চলাটা তার নিজের কাছেই অদ্ভূত মনে হচ্ছে। হাঁটছে আর ভাবছে মারজান। কেন এমন হল? তার এখনকার কাজটা কী ঠিক হচ্ছে? হাসপাতালে বাবা ঘুমিয়ে আছেন। সে বাবার পকেট থেকে দুটো পাঁচশ টাকার নোট নিয়ে এসেছে। বাবা টের পাননি। বের হওয়ার সময় অবশ্য একটা নার্সের মুখোমুখি হতে হয়েছে তার। নার্সকে কিছু বলতে না দিয়েই মারজান বলেছে, 'সিস্টার, আমি একটু বাইরে থেকে আসছি।' বুক টিপ টিপ করছে মারজানের। এখন এত রাতে সে কোথায় যাবে? মায়ের কথা দাদীর কথা মনে পড়ছে তার। এই রাত শেষেই তার বাড়িতে যাওয়ার কথা। অথচ কোথায় অজানার উদ্দেশ্যে ছুটছে সে। ভাবনার এক কালো পাহাড় মারজানের মাথায় ভর করলো। জীবনের চরম বাস্তবতা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। কোথায় পাবে সে থাকার জায়গা, কোথায় ঘুমাবে? কে বহন করবে তার খরচ? ভাবতে ভাবতে নিজকে নিজেই ধিক্কার দিল মারজান। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। শুরু করল উল্টো পথে হাঁটা। 'আপতত বাড়ি যাওয়া যাক' ভাবল সে। তার পরে সুযোগ বুঝে যথাযথ প্রস্তুতি-পরিকল্পনা নিয়েই প্রয়োজন হলে পালাবে সে।

হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গিয়েছিল সে। হাসপাতালের কাছাকাছি চলে এসেছে। এমন সময় কে একজন পেছন হতে ডাক দিল, 'এই ছেলে দাঁড়াও'। চোখ ঘুরাবার আগেই ঘটে গেল ঘটনাটি। নাকে, মুখে রুমাল চেপে ধরল লোকটি। জ্ঞান হারাল মারজান।  



পর্ব-২
ঠিক রাত তিনটার সময় ঘুম ভাঙলো মারজানের বাবা আরমান আলীর। এত রাতে মারজানের বিছানা খালি দেখে অবাক হলেন তিনি। ভাবলেন, বোধ হয় বাথরুমে গেছে ছেলেটা। কিন্তু কেবিনের দরজার দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলেন, দরজা পুরোপুরি খোলা। দ্রুত বাথরুম চেক করলেন আরমান আলী। না, মারজান বাথরুমে নেই। কেবিনের সম্মুখস্থ করিডোরে চোখ রাখলেন, কেউ নেই। নার্স রুমের সামনে গেলেন তিনি। দু'জন নার্স সারা রাত ডিউটি করে কাতর হয়ে ঘুমোচ্ছে। কী যেন ভাবলেন আরমান আলী, তারপরই অন্যদিকে ছুটলেন। হাসপাতালের চতুর্দিক তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখলেন তিনি। কোথাও মারজানের দেখা না পেয়ে আবার ঘুরে এলেন ডিউটিরত নার্সদের সামনে। ততক্ষণে ফজরের আযান দেওয়া শুরু হয়ে গেছে বিভিন্ন মসজিদে। আরমান আলী অপেক্ষা না করে অস্থির হয়ে ডাকলেন নার্সদেরকে। সব শুনে একজন নার্স বলল, 'ও ফিরে আসেনি?' আরমান আলী বিস্মিত কণ্ঠে জানতে চাইলেন, 'ফিরে আসেনি মানে? আপনি কী ওকে কোথাও যেতে দেখেছেন?' নার্স বিনয়ের সাথে জবাব দিল, 'জ্বি আংকেল, আমি একটি ছেলেকে বাইরে যেতে দেখেছি। ও আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই দ্রুত চলে যায়।'

পুরো আকাশটা আরমান আলীর মাথায় ভেঙে পড়ল। মারজান এভাবে চলে গেল কেন? ফোন দিলেন, বাড়িতে এবং আত্মীয় স্বজনদের কাছে। কিন্তু সকলেই অবাক হওয়া ছাড়া কোন সন্ধান দেতে ব্যর্থ হল। এত রাতে অচেনা এক শহরে এতটুকু একটি ছেলে কীভাবে চলে গেল? এক সাগর চিন্ত আরমান আলীর ব্লাড প্রেসারকে হাই করে তুলল। শেষে তিনি ধরে নিলেন, মারজান হয়তো কোন প্রয়োজন কিংবা এমনিতেই হাসপাতাল থেকে বাইরে বের হয়েছিল। কেউ তাকে অপহরণ করেছে হয়তো। অথবা রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে, তাই ফিরে আসতে পারেনি। অন্যদিকে ভোর বেলা মোবাইল ফোনে মারজান হারানোর সংবাদে তার মা ও দাদী কেঁদে অস্থির হয়ে গেলেন। সবাই মিলে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলেন, আল্লাহ যেন তাদের অবুঝ এই সন্তানটিকে ফিরিয়ে দেন। আরমান আলী পরদিনই পত্রিকায় নিখোঁজ সংবাদ ছাপালেন। থানায় জিডি করলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হল না। কারণ এ জাতীয় ঘটনা বাংলাদেশে প্রতিনয়তই ঘটে থাকে। তাই মারজান হারানোর বিষয়টা কোনভাবেই তার পরিবার, আত্মীয় এবং বন্ধুবান্ধব ছাড়া কারো কাছেই কোন গুরুত্ব বহন করলনা।

মারজান চোখ খুলেই নিজেকে একটি অন্ধকার রুমে আবিষ্কার করল। চারদিকে কালো অন্ধকারের মধ্যে সে কিছুই দেখতে পেলনা। চোখদ্বয় ঝিমঝিম করতে লাগল। এই সময় সে কাউকে মোবাইলে আলাপ করতে শুনল, 'বস, ছেলেটির জ্ঞান ফিরেছে।' ধীরে ধীরে সব ঘটনা মনে হতে লাগল মারজানের। চোখে হাত দিয়ে বুঝল তার চোখ বাঁধা। সে অনেকটা গোঙানির স্বরে বলল, 'আ-মি কো---থা--য়? আ--মা-র চো---খে---র বাঁ---ধ-----খু----লে -----দা--ও।' ততক্ষণে একটি লোক মারজানের নিকটে এসে বলল, 'তুমি তো দেখছি বেশ শান্তভাবেই কথা বলছো। এই আজাদ, ওর চোখের বাঁধনটা খুলে দেয় তো।' মারজান ওদের কথাবার্তায় স্পষ্টই বুঝতে পারল যে সে এখন ছেলেধরার হাতে বন্দী। ভয়ে তার বুকটা কেঁপে উঠল। ছেলেধরা নামটা তার কাছে সবসময় হাস্যকর মনে হত। অথচ এখন সে অনুভব করছে আসলেই এরা বিপজ্জনকই হয়। মনে মনে আল্লাহর সাহায্য চাইতে লাগল মারজান।

আজাদ নামক লোকটি মারজানের চোখের বাঁধন খুলে দিলে ধীরে ধীরে সে সবই দেখতে পেল। দেখতে পেল সে কোন ঘরে বন্দী নয়, বরং খোলা আকাশের নিচে নৌকায়। এসময় আজাদ যাকে 'বস' সম্বোধন করেছিল সেই জঙ্গী টাইপের লোকটি বলল, 'ভয় নেই আজাদ, আমরা সীমান্ত পার হয়ে অনেক দূরে চলে এসেছি। এখন অন্তত গুলির মুখে পড়তে হবেনা।' যে মারজান সময় দুষ্টুমি করে সময় কাটাতো, মা-বাবার কথা শুনতো না, সেই মারজানের মনে আজ ভীষণ ভয় ঢুকলো। চরম বিপদ নিজেই সে ডেকে এনেছে, ভাবল মারজান। তাই এখন করণীয়টাও তাকেই নির্ধারণ করতে হবে। যেহেতু সীমান্ত পার হয়ে মানে দেশের বাইরে চলে এসেছে, সুতরাং সহসাই কেউ তাকে বাঁচাতে আসবে বলে মনে হয়না। তাই অনেক ভেবে চিন্তে মারজান কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে ওদের কাছে জানতে চাইল, 'তোমরা কারা? আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?' আজারদ হাসতে হাসতে বলে উঠল, 'দেখেছেন বস, ছেলেটার বয়সই বা কত হবে? এর মধ্যে ভয়-ডর কিছু আছে বলে মনে হয় না।' বস জবাবে বলল, 'আমি তো কাল রাতে ওকে একা শহরে হাঁটতে দেখে এটাই অনুমান করেছিলাম। আর সেজন্যই ওর জন্য এই ব্যবস্থা।' লোকটির এ কথা শুনে মারজানের মনে সাহস আরো কিছু বর্ধিত হল। সে বলল, 'কী হল, আমার প্রশ্নের জবাব তো পেলাম না?'

'মানুষের কিডনি, কলিজা, চক্ষু ইত্যাদি বিক্রি করে আমরা জীবিকা নির্বাহ করি। আমরা একটি আন্তর্জাতিক শিশু পাচারকারী দলের সদস্য। প্রতি মাসে কমপক্ষে ৫০ জন শিশু আমরা দেশের বাইরে পাচার করি। বাকীদের কেটে ফেলি। আশা করি তোমার প্রশ্নের উত্তর তুমি পেয়ে গেছো খোকা?' বলল আজাদের বস শফিক। মারজানের মনে হল লোকটি এতক্ষণ কিছু মুখস্ত বুলি আওড়াল। তবে সে এ বিষয়ে নিশ্চিত যে, আজ এদের হাত থেকে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই তাকে উদ্ধার করতে পারবে না। তাই আবারও মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে লাগল সে। চোখ বন্ধ করে ভাবল কিছুক্ষণ। তার পর ঝাঁপ দিয়ে নিজের দেহটাকে নৌকার বাইরে ফেলে দিল। নদীর পানিতে 'ঝপ্পাস' করে আওয়াজ হল। শিকার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে দেখে আজাদ সাথে সাথে ধারালো একটি ছুরি মারজানকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিল। মারজান পানিতে পড়েই গ্রামের পুকুরে এবং নদীঘাটে প্র্যাকটিস করা ডুব সাঁতার দিতে শুরু করেছিল। আজাদের ছুরিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হল না তবুও। গেঁথে গেল মারজানের পিঠে। পানির নিচে সাতাররত অবস্থাতেই কঠিন যন্ত্রনা অনুভব করল সে। নদীর ঢেউয়ের সাথে তলিয়ে গেল মারজান। সাদা পানিতে ভেসে বেড়াতে লাগল তার শরীরের টাটকা লাল রক্ত। এ সময় দু'টি যাত্রীবাহী বোট এদিকেই আসছে দেখে পিছু হটে গেল আজাদেরা। 



পর্ব-৩
ঘনিষ্ঠ বন্ধু মারজানের নিখোঁজ হওয়ার সংবাদে ব্যথিত হয়ে উঠল আরিফুল ইসলাম বাঁধন। মারজানকে না পেয়ে ভীষণভাবে একাকিত্ব বোধ করতে লাগল সে। আসলে প্রতিবেশি এবং ক্লাসমেট হওয়ার কারণে দুজনে খুবই আপন ছিল। একজন আরেকজনের মুখের আইসক্রীম পর্যন্ত ভাগাভাগি করে খেত ওরা। শুধু স্বভাবগত দিক থেকে মারজানের চেয়ে কিছুটা শান্ত প্রকৃতির ছিল বাঁধন। বাবা-মা'র অবাধ্য হতো না কখনোই।

স্কুলে গ্রীষ্মকালীন ছুটি ঘোষিত হল। বাঁধন কোন অবস্থাতেই মারজানকে ছাড়া এ ছুটি উপভোগ করতে পারছিলনা। হতাশার কালো মেঘে ঢাকা পড়ল তার আনন্দ। বাবা-মা তাকে তার নানা বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। বাঁধনের মামাবাড়ি ঝিনাইধহ শহরেই। মামাতো ভাই আতিকও পড়ে ওদেরই সাথে ক্লাস এইটে। বাঁধনের মা-বাবার ধারণা বন্ধু মারজানের অভাব হয়তো ও কিছুটা পূরণ করতে পারবে। অনেকটা তাই হল। তাদের দুজনের মধ্যে অপূর্ব সম্পর্ক তৈরি হল। আতিক বলল, ' আসলে তোর বন্ধু মারজানের জন্য আমাদের একটা কিছু করা দরকার।'
'তুই ঠিকই বলেছিস। কিন্তু করবটা কী? বাঁধন হতাশার সুরে জবাব দিল।
'গোয়েন্দাগিরি করব। আমাদেরকে গোয়েন্দা হতে হবে।' আতিকের চোখে আনন্দ।
'দেখ আতিক, গল্প আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য আছে। আমরা গল্পের মধ্যে যেভাবে দেখি তিন গোয়েন্দা, দুই গোয়েন্দা অত্যন্ত জটিল সমস্যার সমাধান করে ফেলে, বাস্তবে কিন্তু সেরকম কিছু করা সম্ভব নয়। '
'দূর, তুই বাস্তবের দেখেছিস কি?' শোন আমরা চেষ্টা করে দেখি। চেষ্টা করে যদি কিছু করতে না পারি তখন বাস্তবতার অজুহাত দেখাবো।' আতিকের কথাটি বেশ আকৃষ্ট করল বাঁধনকে। সেই সাথে সে পুলকিত হল খানিকটা।

পরদিন সকালে দুজনে ঝিনাইধহ সদর হাসপাতালে গেল। পার্শ্ববর্তী এলাকাটি পর্যবেক্ষণ করে দেখল। ফেরার পথে বাঁধন জানতে চাইল, 'কি লাভ হল হাসপাতাল ঘুরে?' আতিক মাথা নাড়িয়ে জবাব দিল, 'লাভ-ক্ষতির হিসাব করে গোয়েন্দাগিরি হয়না। মারজানের সন্ধান পেতে আর বেশি দেরি হবে না।'
'কি আশ্চর্য! কিছুই যখন জানা গেল না, তখন তুই কী করে বলছিস দেরি হবেনা?'
আল্লাহ ভরসা। আমরা শীঘ্রই মারজানকে পেতে যাচ্ছি। তুই শুধু আমাকে সাপোর্ট করে যাবি।' আতিকের কথায় আশান্বিত হল বাঁধন। বলল, 'সাপোর্ট তোকে অবশ্যই করবো। তাছাড়া মারজান আমার বন্ধু। ওর জন্য আমার দায়িত্বটুকু তো পালন করতেই হবে।'

ওই দিন রাতে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের সম্মুখে একটি ছেলেকে একা একা পায়চারি করতে দেখা গেল। রাত বারোটা থেকে তিনটা পর্যন্ত শহরের এ মাথা ও মাথা চক্কর দিল ছেলেটি। শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে গেল। দুচোখে ঘুম এলনা তবুও আতিকের। সে অনেক গোয়েন্দা কাহিনী পড়েছে। প্রতিটি কাহিনীতে বিশেষ করে কিশোর গোয়েন্দা কাহিনীগুলো পড়ার সময় কল্পনায় সে নিজের কথা ভাবতো। এখন এত বড় সুযোগ হলোয় নষ্ট করা ঠিক হবেনা। ভাবল আতিক হাসান।

আতিক অনুমান করেছিল মারজান নিজে থেকে কোথাও হারিয়ে যায়নি এবং তাকে যে বা যারা কিডন্যাপ করেছে তারা তাকে এই সদর হাসপাতালের সামনে থেকেই করেছে। এর মানে রাতে এখানে ছেলেধরাদের আনাগোনা আছে। আর তাই সে নিজে কাউকে না জানিয়ে গভীর রাতে এই রাস্তাতে হাঁটতে শুরু করেছিল। ভাবছিল নিজে ধরা খাবে ওদের হাতে, তারপর কৌশলে বের করবে মারজানের সন্ধান। কিন্তু ও জানেনা, সব অনুমান সত্যে পরিণত হয় না। সে ছোট মানুষ, তাছাড়া আগে কোনদিন এসমস্ত কাজে জড়িত হয়নি। পরপর তিন রাত আতিক এভাবে চেষ্টা করে ব্যর্থ হল। এক রাতে পুলিশের হাতে তো প্রায় ধরা পড়েই গিয়েছিল।



৪র্থ পর্ব
এর কিছুদিন পর বাঁধন তার গ্রামের বাড়িতে চলে গেল। একটা বিষয় বাঁধনকেও চিন্তিত করে তুলেছিল। গোয়েন্দা কাহিনী সে ও কম পড়েনি। এমন কি নিজে একটি গোয়েন্দা কাহিনী টাইপের গল্প লিখেছে পর্যন্ত। মাসিক ফুলকলি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল সেটা। অথচ ওরা দু'জনে মিলে মারজানকে উদ্ধার করার কোন সূত্রই বের করতে পারলনা। বাড়ি ফিরে বাঁধনের মনে হল বিষয়টি তার অন্যান্য বন্ধুদের জানানো দরকার।

গ্রীষ্মের ছুটি শেষে আবার স্কুল শুরু হল। সবাই জড়ো হল স্কুল গেটের উল্টোদিকের বটতলাতে। এখানেই মারজানের নেতৃত্বে আড্ডা দিত বিশ্বচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্ররা। কথাটা বাঁধনই শুরু করল প্রথমে। তারপর অন্যরাও এ বিষয়ে প্রচুর আগ্রহ দেখাল। সবাই মোটামুটি একমত হল তারা একটা গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করবে। সংস্থা মানে একটা ছোটখাটো কমিটি। সর্বমোট ছয়জনকে নিয়েই এই কমিটি গঠিত হবে, সিদ্ধান্ত হল। বাঁধন ইচ্ছে করেই তার মামাতো ভাই আতিক হাসানের বিষয়টি এখানে বলল না। পরের শুক্রবার সবাই একত্রিত হল মারজানের বাড়িতে। মারজানের পড়ার কক্ষে বসেই আলোচনা শুরু করল তার। তাদের উদ্দেশ্য জানতে পের মারজানের মা-বাবা, দাদীসহ পাড়ার সকলেই খুশি হলেন।

বাঁধন বলল, 'প্রথমেই আমাদের বুঝে নিতে হবে কার কি দায়িত্ব?'
'তাতো অবশ্যই এবং আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে একটি শৃঙ্খলিত পদ্ধতিতে। মনে রাখতে হবে কেউ যেন আমরা নিজেদের দায়িত্ব পালনে গাফলতি না দেখাই।' বাঁধনের কথার পিঠেই কথাগুলো জুড়ে দিলে বাহার।

বাঁধন আবার শুরু করল, 'আমাদের ধারণা মারজান ছেলেধরাদের হাতেই পড়েছে। কারণ শহরে গত দুই মাসে পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী ৪ শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা আছে। পত্রিকায় আসেনি এরকম ঘটনা থাকাটও অস্বাভাবিক নয়। অথচ প্রশাসন এ ব্যাপারে কিছুই করতে পারছে না।' ওর কথা সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। কথা শেষ হতেই আশিক আকবর বলল, 'বুঝলাম মাননীয় সভাপতি, তা এখন কি বলবেন যে আমাদের মধ্য থেকে কাকে আপনি সেক্রেটারি হিসেবে বেছে নিবেন?'
'কিসের সভাপতি-সেক্রেটারি, আমরা সবাই বন্ধু এটাই আমাদের পরিচয়। এখানে আমরা রাজনীতি করতে আসিনি। তবে অফিসিয়াল কিছু নিয়ম আছে। যেনম চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যে কোন একজন দেবে। আমার মনে হয় এ দায়িত্বটা অর্থাৎ গোয়েন্দা প্রধান পদটা আমরা আশিক আকবরকেই দেই।' বলল বাঁধন। প্রতিবাদ জানাল আবু তাহের বাহার। বলল, 'এ হয় না, গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে আমরা তোকেই মেনে নিয়েছি।' ওর কথায় সবাই সায় দিল। বাঁধন একটু ঠিকঠাক হয়ে বসল। বলল, 'ঠিক আছে সবাই একমত হলে আমি তো আর না করতে পারি না। আমার সাথে চীফ এসিস্ট্যান্ট হিসেবে আমি আশিক আকবরকে চাই। ওর সহযোগিতা আমার প্রতি মুহূর্তে দরকার পড়বে। বাকি সবাই আমাদের টিমের এক্সিকিউটিভ মেম্বার, কেমন?' সবাই করতালির মাধ্যমে তাদের স্বাগত জানাল। সিদ্ধান্ত হল প্রতি শুক্রবার তাদের এই গোয়েন্দা বাহিনীর মিটিং বসবে। গোয়েন্দা দলের একটি নামও ঠিক হয়ে গেল ওই দিন। 'মারজান গোয়েন্দা বাহিনী'। নামটি প্রস্তাব করেছিল সায়িদ প্লাবন। সবাই সেদিনের মত বিদায় নিল। সকল কিশোরের মনে তখন অ্যাডভেঞ্চার অ্যাডভেঞ্চার ভাব। 





৫ম পর্ব
শিউলির মা নদীর ঘাটে পানি নিতে এসেছেন। শিউলিও সাথে এসেছিল। হঠাৎ শিউলি চিৎকার দিয়ে উঠলো, 'মা দেখ, একটা মরা মানুষ! পিঠে চাক্কু গাঁথা।' শিউলির মাও দেখে আঁৎকে উঠলেন। দুজনে নিকটবতী হল লাশটির। মৃত ছেলেটার পিঠে রক্তের খাবলা দেখে শিউরে উঠল শিউলি। তার শরীর কেঁপে উঠল। কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারিত হল, 'মা, ওকে এভাবে কে মারল?'

প্রশ্নের জবাব দিলেন না শিউলির মা। কারণ তার মনেও তখন একই প্রশ্ন। ছেলেটির চেহারা দেখে মনে হল আগে কোথাও দেখেছেন তিনি। পূবাকাশে সূর্য উপরের দিকে এগোচ্ছে। চারদিকে সবুজ ফসলের খামার। এরই এক পাশে কুশিয়ারা নদীর চরে পিঠে ছুরি গাঁথা একটি ১৩-১৪ বছরের কিশোর! কী অস্বাভাবিক ঘটনা। ঘটনার আগা-গোড়া কিছুই না বুঝে শিউলির মা বলল, 'যা শিউলি, তাড়াতাড়ি তোর বাবাকে ডেকে নিয়ে আয়।' শিউলির বাবা পেশায় শ্রমিক। একেবারে দিন মজুর। অন্যের বাড়িতে কাজ করেই সংসার চালান। তবে এই নদীর চরে যে ক্ষেত খামার তাদের আছে তা দিয়েই মোটামুটি এলাকার মধ্যে অবস্থান ধরে রেখেছেন। রহম আলী মানুষ হিসেবেও খারাপ না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। লেখাপড়া না জানলেও তাকে কিন্তু অক্ষর জ্ঞানহীন বলে মনে হয় না। প্রতিদিন ফজরের নামাজ থেকে এসে সুর করে কুরআন তেলাওয়াত করেন।

প্রতিদিনের মতো আজও রহম আলী কুরআন তেলাওয়াত শেষ করে বাইরে বেরোতে যাবেন এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে শিউলি এসে ডাক দিল, 'বাবা, ও বাবা; জলদি এসো। নদীর চরে একটা মরা ছেলে পাওয়া গেছে।' রহম আলী দ্রুত নদীর চরের দিকে ছুটলেন। সবকিছু দেখে ছেলেটিকে নিয়ে হাসপাতালে চলে গেলেন। তার ধারণাই ঠিক হল। ডাক্তার বললেন, 'ছেলেটি এখনও বেঁচে আছে। সারা শরীরে ওই একটাই জখম, প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। আমরা রক্ত দিচ্ছি। আশা করি খুব শীঘ্রই ছেলেটির জ্ঞান ফিরে আসবে।' 
 
 
undefined

ছেলেটি বেঁচে আছে জানতে পেরে রহম আলী আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া জানালেন। একই সাথে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলেন ওকে দ্রুত সুস্থ করে দেওয়ার জন্য। 'এমন ফুটফুটে একটি কিশোর, কে ওর এমন অবস্থা করল?' ভাবছিলেন রহম আলী। এদিকে কিছুক্ষণের মধ্যে মারজানের জ্ঞান ফিরে এলে সে সব কিছু আন্দাজ করার চেষ্টা করল। প্রথমে কিছুই মনে করতে পারছিল না। ধীরে ধীরে তার সব মনে পড়ে গেল। রহম আলী তাকে বাড়িতে নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার নাম কী বাবা?'
'আল মারজান' জবাবে জানাল ছেলেটি। তারপর সে জানতে চাইল, 'আমি কোথায়, এখানে কীভাবে এলাম?' 'তুমি এখন সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রামে' বলে বিস্তারিত জানালেন রহম আলী। তারপর জানতে চাইলেন, 'ঘটনা কীভাবে ঘটল?'

মারজান ভাবল, যে উদ্দেশ্যে সে হাসপাতাল থেকে পালিয়েছিল সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আল্লাহ সম্ভবত তার মনের আশা পূরণ করার জন্য এই ব্যবস্থা নিয়েছেন। তাই সে সিদ্ধান্ত নিল তার পরিচয় গোপন রাখবে। বাড়িতে না গিয়ে চেষ্টা করবে এদিকে কোথাও থেকে যাওয়ার। সে রহম আলীকে বলল, 'আমার কেউ নেই। ঢাকায় এক চাচার বাসায় থাকতাম। চাচার ছেলেরা ভবিষ্যতে আমি তাদের সম্পত্তির অংশীদার হয়ে যাব ভেবে আমাকে খুন করতে চেয়েছিল। তারা আমার চোখ বেঁধে কোথায় নিয়ে গিয়েছিল জানি না। এক সময় একটি নদীর তীরে আমাকে ছুরি দিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করলে প্রাণ বাঁচাতে আমি নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ি।'

মিথ্যে বলায় ওস্তাদ ছিল মারজান আগেই। তাই এই বিপদ বা সংকটের সময়েও তার মুখের মিথ্যা কথাগুলো রহম আলী ও তার বাড়ির সকলের হৃদয়কে আবেগাপ্লুত করে তুলল। ওর কথাগুলো অবিশ্বাস করা কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না। রহম আলী আবেগ মাখানো কণ্ঠে বললেন, 'তুমি কোন চিন্তা করো না। এখন থেকে তুমি আমারই ছেলে। তোমার কোন ভয় নেই, তুমি আমার এখানেই থাকবে। ভালই হল, আমার কোন ছেলে নেই। এখন থেকে আমার এক ছেলে এক মেয়ে।'

শিউলি বলে উঠল, 'মারজান ভাইয়া, আমার সাথে খেলতে হবে কিন্তু।'
'অবশ্যই বোন আমার, তোমার সঙ্গে না খেললে আমি সময় কাটাবো কীভাবে?' হেসে বলল মারজান। সেদিন থেকেই মারজানের নতুন জীবন শুরু হল। মারজান রহম আলীকে জানালো সে ক্লাস এইট পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। তাই নতুন বছরে রহম আলী তাকে এলাকার 'করামত আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে' নবম শ্রেণীতে ভর্তি করার ব্যবস্থা নিলেন। স্কুলে ভর্তি হবার অতি অল্প দিনেই মারজান স্কুলের সব ছেলেদের সাথে ভাব করে ফেলল। কিন্তু তার আগের সেই দুষ্টুমি করার অভ্যাসটা সে একেবারে হারিয়ে ফেলল। এখানে সে যদিও রহম আলীর বাড়িতে নিজের বাড়ির মতোই থাকে, তবুও বারবার তার মায়ের কথা মনে পড়ে। দাদীর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে বন্ধু বাঁধনসহ সকলের কথা।

এক রাতে মারজান স্বপ্নে দেখল তার মা মারা গেছেন। মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহুর্তে মা তাকে বলছিলেন, 'তুই আমার পেটের ছেলে হয়ে এ কাজ করতে পারলি? আমাদের ছেড়ে তুই কোথায় আছিস একটাবার জানালেও পারতিস।' স্বপ্নে সে আরো অনেক কিছুই দেখল কিন্তু ঘুম ভাঙার পর তার আর কিছুই মনে থাকল না। কেবল মনে থাকল মায়ের মৃত্যুর কথা। সেদিন স্কুলে গিয়ে মারজান ক্লাসে মন বসাতে পারলনা। বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় তুহিন জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার মারজান? তোমার কী শরীর খারাপ?' তুহিন মারজানের নতুন বন্ধু। কিন্তু এখানে কেউ এখনও মারজানকে 'তুই' সম্বোধন করে কথা বলে না। মারজান একটি্ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'না, শরীর ঠিকই আছে, তবে মনটা খুব খারাপ।'
'কিসের জন্য মন খারাপ, জানতে পারি কী?' বলে মারজানের কাঁধে হাত রাখল তুহিন। 'দু:খিত' বলে হাতটা ছাড়িয়ে নিল মারজান। তুহিন মনে মনে অপমান বোধ করলেও মুখে কিছুই বলল না। তার মনে পড়ল বড় ভাই শাহীনের কথা, 'কেউ তোমার সাথে খারাপ আচরণ করলেও তুমি তাকে ভাল আচরণের মাধ্যমে জয় করার চেষ্টা করবে।' অবশ্য সে দৃষ্টি থেকে মারজান তেমন কোন খারাপ আচরণ করেনি তার সাথে। তবুও স্কুলে মারজান তুহিনের ক্লাসমেট হওয়াতে একজন আরেকজনের কাছে সুখ-দু:খ শেয়ার করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মারজানের আচরণটা সেরকম ছিল না।

তুহিনের বড় ভাই শাহীন ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। সে থাকে সিলেট শহরে। সেদিন একুশের ফেব্রুয়ারিতে বাড়ি এসে জানাল, সিলেট শহরে একটি কিশোর গোয়েন্দা টিম এসেছে। তারা নাকি তাদেরই এক হারানো বন্ধুকে উদ্ধারের জন্য এই গোয়েন্দা টিম গঠন করেছে। এই চাঞ্চল্যকর খবরটি এলাকায় বিশেষ করে করামত আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না। স্বাভাবিভাবেই এ খবরটা মারজানকে বিচলিত করে তুলল। ওরা কি তাহলে আমারই বন্ধু? জানতে হবে ওরা কোথা থেকে এসেছে? 
 
 
 
undefined

পর্ব-৭
পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আল মারজান গোয়েন্দা বাহিনীর একটি গ্রুপ ঢাকায় গিয়ে পৌছলো। এ গ্রুপের নেতৃত্বে ছিল আশিক আকবর। সাথে ছিল প্লাবন সায়িদ ও আবু তাহের বাহার। বাহারের খালার বাসা ধানমন্ডির ২৫ নম্বর রোডে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানেই উঠলো তারা তিনজন।
অনেক খোঁজাখুজির পর হতাশ হয়ে পড়ল তিন গোয়েন্দা। কোন ক্লু তাদের সামনে ধরা দিলনা। 'রাজধানী ঢাকায় তন্ন তন্ন করে খুঁজেও মারজানকে পাওয়া যাবে না' বুঝতে পারল ছেলেরা। তাই এক সপ্তাহ পর জন্মভূমি ঝিনাইদহে ফিরে গেল তারা। রিপোর্ট করল গোয়েন্দা প্রধানকে। গোয়েন্দা প্রধান আরিফুল ইসলাম বাঁধন এতে হতাশ হল না একটু্ও। বরং এই বলে ওদের সান্তনা দিল যে, 'তোদের এই সফর ভবিষ্যতে আমাদের গোয়েন্দাগিরিতে অনেক কাজে লাগবে।'
'তা না হয় লাগবে। কিন্তু এখন যে কেস নিয়ে আমরা কাজ করছি তার কী হবে?' বলল বাহার। 'সমাধান তো অবশ্যই একটা হতে যাচ্ছে।' বলে ভাবতে লাগল বাঁধন। ওর এই চেহারাটা সকলের কাছেই পরিচিত। যখন কোন বিষয়ে খুব বেশি চিন্তা করে তখন ওকে এমন দেখায়। মনোভাব বুঝতে পেরে নীরব থাকল বন্ধুরা। এমন সময় মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল বাঁধনের। অন্যমনস্ক ছিল সে, তাই ফোনটা রিসিভ করল আশিক আকবর।
'হ্যালো আল মারজান প্রধান?'
'না, আমি এ্যাসিস্ট্যান্ট। ওদিকের খবর কী আখলাক?'
'খবর খুব সাংঘাতিক। জানতে পারলাম সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় একটি অজ্ঞান ছেলেকে নদীর তীরে পাওয়া গেছে কিছুদিন আগে। বর্তমানে সে গ্রামের এক কৃষক পরিবারে বসবাস করছে। এখানকার একটি স্কুলে ও ক্লাস নাইনে এডমিশন নিয়েছে।'
'তোমরা এখনও সেই স্কুলে যাওনি?'
'না, আমরা আসলে অন্য একটা প্রবলেমে আছি। আমাদের শখের গোয়েন্দা প্রাহীকে পাওয়া যাচ্ছে না।'
'বলিস কী'?
'আজ সকালে প্রীতিরাজ রেস্টুরেন্টে নাস্তা করতে গিয়েছিলাম। এটা সিলেটের জিন্দাবাজার এলাকা। মূল শহর। নাস্তা শেষে সবাই একসাথে বের হলাম। ও যে কোনদিকে গেল কেউ খেয়াল করতে পারিনি।'
'ফোন ছিল না ওর সাথে?'
'না, ওকে তো এখনও ফোন ব্যবহার করতে দেয় না ওর বাবা-মা। তাছাড়া ও মুক্ত থাকলে তো যে কোন দোকান থেকে আমাদের ফোন করতোই।'
'তার মানে তুই বলছিস, মারজানকে উদ্ধার অভিযনে গিয়ে প্রাহীকে হারাতে হচ্ছে!'
'না, ঠিক তা না। এখনও সন্ধ্যা হয়নি, ও কোথায় গেছে কে জানে? চলে আসবে হয়তো এক্ষুণি!'
'শোন আখলাক, বিষয়টা খুবই সেনসেটিভ। প্রাহীর কিছু হলে আমাদের কাউকে ছেড়ে দেবে না ওর বাবা-মা।'

(বাকী অংশ পড়তে ৮ম পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন।)
  

   

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন